দর্শন লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
দর্শন লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

সোমবার, ৮ আগস্ট, ২০২২

বুদ্ধিবাদ কাকে বলে ? জ্ঞানের উৎস সম্পর্কে বুদ্ধিবাদের মূল বক্তব্যগুলি আলােচনা করাে ।

একাদশ শ্রেণী দর্শন প্রশ্নোত্তর xi class 11 philosophy Question answer বুদ্ধিবাদ কাকে বলে জ্ঞানের উৎস সম্পর্কে বুদ্ধিবাদের মূল বক্তব্যগুলি আলােচনা করাে budhibad kake bole gganer utsho somporke budhibader mul boktboguli alochona koro


উত্তর : জ্ঞানের উৎপত্তি সংক্রান্ত যে সমস্ত দার্শনিক মতবাদ রয়েছে , তাদের মধ্যে বুদ্ধিবাদ হল অন্যতম ।বুদ্ধিবাদ অনুযায়ী বুদ্ধি বা প্রজ্ঞাই হল জ্ঞানের একমাত্র উৎস । অর্থাৎ , বুদ্ধি বা প্রজ্ঞা ছাড়া জ্ঞানের আর দ্বিতীয় কোনাে উৎস নেই । জ্ঞানের মূল বৈশিষ্ট্য হল সর্বজনীনতা । জ্ঞানের সর্বজনীনতা প্রকাশিত হয় বুদ্ধি বা প্রজ্ঞার মাধ্যমেই । তাই বুদ্ধি বা প্রজ্ঞাকে জ্ঞানের একমাত্র উৎসরূপে গণ্য করা হয় ।

জ্ঞানের উৎস সম্পর্কে বুদ্ধিবাদের মূল বক্তব্য -

[        ] প্রাচীন বুদ্ধিবাদীদের অন্যতম হলেন প্রখ্যাত গ্রিক দার্শনিক পারমিনাইডিস , সক্রেটিস , প্লেটো প্রমুখ । তাদের মতে , যথার্থ জ্ঞানের একমাত্র উপায় হল বুদ্ধি বা প্রজ্ঞা । আমরা সামান্য ধারণার মাধ্যমে জ্ঞানলাভ করি , আর এই সামান্য ধারণা আমরা প্রাপ্ত হই বুদ্ধির মাধ্যমেই । 


[        ] আধুনিক বুদ্ধিবাদীদের অন্যতম হলেন প্রখ্যাত ফরাসি দার্শনিক রেনে দেকার্ত , ব্রিটিশ দার্শনিক বেনেডিক্ট স্পিনােজা,গটফ্রেড উইলহেম লাইবনিজ প্রমুখ । প্রখ্যাত জার্মান দার্শনিক ভলফ এবং কান্টের নামও এ প্রসঙ্গে বিশেষভাবে উল্লেখ্য । এই সমস্ত দার্শনিকদের সকলেই স্বীকার করেন যে , বুদ্ধি বা প্রজ্ঞাই হল জ্ঞানলাভের প্রকৃষ্ট উপায় ।

 বুদ্ধিবাদের মূল বক্তব্যগুলি নীচে উল্লেখ করা হল—
 
প্রথম বক্তব্য : বুদ্ধিবাদ অনুসারে বুদ্ধি বা প্রজ্ঞাই হল জ্ঞানের একমাত্র উৎস । বুদ্ধিবাদীরা দাবি করেন যে , মানুষের মনই হল বুদ্ধির মূল উৎস এবং এর দ্বারাই লাভ করা যায় ধারণা । আর এই ধারণা থেকেই উৎসারিত হয় জ্ঞান । 


দ্বিতীয় বক্তব্য : বুদ্ধি বা প্রজ্ঞা ছাড়া জ্ঞানের আর দ্বিতীয় কোনাে উৎস নেই । অভিজ্ঞতার মাধ্যমে জ্ঞান লাভ করা যায় বলে অভিজ্ঞতাবাদীরা যে দাবি করেন , তা যথার্থ নয় । কারণ , অভিজ্ঞতা দ্বারা কখনােই সার্বিক ও নিশ্চিত জ্ঞান লাভ করা সম্ভব নয় । এরূপ জ্ঞান লাভ করা সম্ভব শুধুমাত্র বুদ্ধির দ্বারাই । 


তৃতীয় বক্তব্য : বুদ্ধিবাদ অনুসারে আমাদের সমস্তপ্রকার জ্ঞান উৎসারিত হয় সহজাত ধারণা তথা আন্তর ধারণার মাধ্যমে । আর এই সহজাত ধারণার জ্ঞান লাভ করা যায় শুধুমাত্র বুদ্ধি তথা প্রজ্ঞার মাধ্যমেই । 

চতুর্থ বক্তব্য : বুদ্ধিবাদী দার্শনিকগণ বলেন যে , জ্ঞানের বাস্তব মূল্য আছে , আর তা লাভ করা যায় শুধুমাত্র বুদ্ধির মাধ্যমেই । ইন্দ্রিয় অভিজ্ঞতার দ্বারা মূল্যের জ্ঞান লাভ করা যায় না ।


পঞ্চম বক্তব্য : বুদ্ধিবাদ অনুসারে দর্শনের যথার্থ পদ্ধতি হল অবরােহাত্মক পদ্ধতি । কারণ , প্রকৃত জ্ঞান বলতে গাণিতিক জ্ঞানকেই বােঝানাে হয় । গাণিতিক জ্ঞানে কতকগুলি স্বতঃসিদ্ধ সূত্রের ওপর নির্ভর করেই অবরােহাত্মক পদ্ধতিতে সুনিশ্চিত ও সর্বজনীন জ্ঞান লাভ করা যায় । 


ষষ্ঠ বক্তব্য : বুদ্ধিবাদ অনুসারে পূর্বতঃসিদ্ধ সংশ্লেষক বচন সম্ভব । সাধারণত যে সমস্ত বচন পূর্বতঃসিদ্ধরূপে গণ্য, তা বিশ্লেষক হয়, আর যে সমস্ত বচন পরতঃসাধ্যরূপে গণ্য, তা সংশ্লেষক হয় । কিন্তু বুদ্ধিবাদীরা দাবি করেন যে , পূর্বতঃসিদ্ধ সংশ্লেষক বচনের মাধ্যমেও জ্ঞানের প্রকাশ সম্ভব । যেমন 7+ 5 = 12 একদিকে যেমন পূর্বতঃসিদ্ধ, অপরদিকে তেমনি সংশ্লেষকও । কারণ 7 এবং 5 যােগ করলে 12 সংখ্যাটি অনিবার্যভাবে নিঃসৃত হয় বলেই তা পূর্বতঃসিদ্ধরূপে গণ্য হয় । আবার 12 সংখ্যাটি 7 এবং 5 ছাড়া আরও একটি নতুন সংখ্যারূপে গণ্য হওয়ায় তা সংশ্লেষকরূপে স্বীকৃত ।
সপ্তম বক্তব্য : বুদ্ধিবাদ অনুসারে স্পষ্টতা,প্রাঞ্জলতা ও বিবিক্ততা প্রভৃতি হল জ্ঞানের মাপকাঠি । অর্থাৎ জ্ঞানকে স্পষ্ট হতে হবে , প্রাঞ্জল তথা সরল হতে হবে , এবং বিবিক্ত তথা স্বচ্ছরূপে গণ্য হতে হবে । জ্ঞানের মধ্যে কোনােপ্রকার স্ববিরােধ থাকা চলবে না ।




শনিবার, ৬ আগস্ট, ২০২২

সকাম ও নিষ্কাম কর্মের মধ্যে পার্থক্য কী ? বিবেকানন্দ কীভাবে নিষ্কাম কর্মকে ব্যাখ্যা করেছেন ?

একাদশ শ্রেণী দর্শন প্রশ্নোত্তর xi class 11 philosophy Question answer সকাম ও নিষ্কাম কর্মের মধ্যে পার্থক্য কী বিবেকানন্দ কীভাবে নিষ্কাম কর্মকে ব্যাখ্যা করেছেন nishkam karmer modhey parthokko ki bibekanonda kivabe nishkam karmake bakha korechen


উত্তর :  ভারতীয় দর্শনে দুপ্রকার কর্মকে স্বীকার করে নেওয়া হয়েছে — সকাম ধর্ম ও নিষ্কাম ধর্ম । সকাম কর্ম হল কামনা বাসনা যুক্ত কর্ম । অর্থাৎ , বলা যায় যে , যে সমস্ত কর্ম আমাদের কামনা বাসনাকে চরিতার্থ করার জন্য করা হয়, সেগুলিকেই বলা হয় সকাম কৰ্ম । এই সকাম কর্মের জন্যই আমাদের কর্মফল ভোগ করতে হয় । অপরদিকে , নিষ্কাম কর্ম হল এমনই কর্ম যা কামনা বাসনা চরিতার্থ করার জন্য কখনোই কৃত নয় । কামনা বাসনা ছাড়া শুধুমাত্র কর্ম করার জন্যই যে কর্ম করা হয় তাকে বলে নিষ্কাম কর্ম । নিঃ(নাই) + কাম ( কামনা ) = নিষ্কাম । অর্থাৎ, যে কর্মের পিছনে কোনাে কামনা থাকে না তাকে বলে নিষ্কাম কর্ম । এরূপ কর্মের কোনাে কর্মফল থাকে না এবং সে কারণেই মানুষকে এর জন্য কোনাে কর্মফল ভোগ করতে হয় না ।নিষ্কাম কর্ম এক আদর্শমূলক কর্ম যা গীতায় স্বীকৃত হয়েছে এবং বিবেকানন্দ তার কর্মযােগের মূল ভিত্তি রূপে উল্লেখ করেছেন এই নিষ্কাম কর্মকে ।

[          ] বিবেকানন্দের মতে নিষ্কাম কার্য : স্বামী বিবেকানন্দ তার কর্মযােগ এ কর্মের আদর্শগত ব্যাখ্যা দিতে দিয়ে শ্রীমদভাগবত গীতায় যে নিষ্কাম কর্মের কথা বলা হয়েছে , তার উল্লেখ করেছেন । তিনি বলেন যে ,প্রকৃত কর্মযােগীকে নিষ্কামভাবে কর্ম সম্পাদন করতে হয় । কারণ , যিনি কর্মযােগী রূপে গণ্য, তিনি কখনােই ফলাকাঙ্ক্ষা নিয়ে কর্ম সম্পাদন করেন না । তিনি শুধুমাত্র কর্মের জন্যই কর্ম সম্পাদন করেন । কর্মযোগীর কর্ম সম্পাদনের ক্ষেত্রে তাই কখনোই কামনা বাসনা থাকা উচিত নয় । কর্মযােগীর শুধুমাত্র নিরন্তর নিষ্কামভাবে কর্ম করে যাওয়াই উচিত , আর কর্মফল ঈশ্বরে সমর্পন করা উচিত । ঈশ্বরই হলেন আমাদের সমস্ত প্রকার কর্মের নিয়ন্ত্রা । এরূপ বিশ্বাসই কর্মযােগীর থাকা উচিত । গীতায় উল্লেখিত কর্মের এরুপ আদর্শকেই স্বামী বিবেকানন্দ তার কর্মযােগের মূল ভিত্তিরূপে উল্লেখ করেছেন ।


[          ] অনাসক্তির শক্তিতে নিষ্কাম কর্ম : কর্মযােগের ষষ্ঠ অধ্যায়ে উল্লেখ করা হয়েছে যে , অনাসক্তিই হল পরিপূর্ণ আত্মত্যাগ । বাহ্যবিষয়ে অনাসক্তি অর্জন করতে হলে নিরন্তরভাবে নিষ্কাম কর্ম করতে হবে । নিষ্কামভাবে কর্ম করার ক্ষমতা মানুষ কখনােই একদিনে আয়ও করতে পারে না । ক্রমিক ও নিরন্তর কর্ম সম্পাদনের মাধ্যমে মানুষ ধীরে ধীরে এরূপ শক্তি অর্জন করতে পারে । মানুষ ক্রমে ক্রমে বুঝতে সমর্থ হয় যে , প্রকৃত সুখ হল স্বার্থপরতার বিনাশে । সে কারণেই মানুষের সকাম ও স্বার্থ যুক্ত কর্ম করা কখনােই উচিত নয় । অনাসক্তিকে আয়ত্ত করে ,দুর্বলতাকে পরিহার করে , মানসিক বলে বলীয়ান হয়ে তবেই কর্মযােগী নিষ্কামভবে কর্ম করতে সমর্থ হয় । 

[          ] মুক্তিতে নিষ্কাম কর্ম : স্বামীবিবেকানন্দ তার কর্মযােগ - এর সপ্তম অধ্যায়ে মুক্তির বিষয়টি আলােচনা করেছেন । বিবেকানন্দের মতে ,মানুষের চরম লক্ষ্য হল মুক্তি । মুক্তি লাভের জন্য মানুষ এই সসীমত্বের বাঁধন কেটে সবকিছুর উর্ধ্বে উঠতে চায় । মুক্তির জন্য মানুষ সমস্তপ্রকার আসক্তিকে ত্যাগ করতে চায় । এই আসক্তি ত্যাগের উপায় হল দুটি নিবৃত্তি মার্গ এবং প্রবৃত্তি মার্গ । নিবৃত্তি মার্গে নেতি নেতি (এটি নয় এটি নয় ) করে সব কিছু ত্যাগ করতে হয় । আর প্রবৃত্তি মার্গে ইতি ইতি করে সবকিছুকে গ্রহণ করে তবে সেগুলিকে ত্যাগ করতে হয় । সাধারণ মানুষ প্রবৃত্তি মার্গকে মুক্তির পথ হিসেবে বেছে নিলেও মহাপুরুষগণ কিন্তু নিবৃত্তি মার্গকেই মুক্তির পথ বলে মনে করেন । যে পথই অনুসরণ করা হােক না কেন , একথা ঠিক যে , মুক্তি পেতে গেলে মানুষকে অবশ্যই নিষ্কামভাবে কর্মযােগের আদর্শে অনুপ্রাণিত হতে হবে । এরূপ বিষয়টিই বিবেকানন্দ তার কর্মযােগে তুলে ধরেছেন । 







শুক্রবার, ৫ আগস্ট, ২০২২

রবীন্দ্রনাথের মানবতাবাদী দর্শনের মূল উৎসগুলি উল্লেখ করাে ও বিশ্লেষণ করাে ।

একাদশ শ্রেণী দর্শন প্রশ্নোত্তর xi class 11 philosophy Question answer রবীন্দ্রনাথের মানবতাবাদী দর্শনের মূল উৎসগুলি উল্লেখ করাে ও বিশ্লেষণ করাে robindronather manobotabadi darshoner mul utsohoguli ullekh koro o bishleshon koro


উত্তর :  রবীন্দ্রনাথের দর্শনকে মূলত মানবতাবাদী দর্শনরূপে উল্লেখ করা হয় । কারণ , তাঁর দর্শনে মানবতাবাদের বিষয়টিই দারুণভাবে প্রতিফলিত হয়েছে । তাঁর দর্শনে এই মানবতাবাদের বিষয়টি বিভিন্ন উৎস থেকে হাজির হয়েছে । মানবতাবাদী দর্শনের মূল উৎসগুলি এখানে উল্লেখ ও ব্যাখ্যা করা হল –

[ 1 ] মানবতাবাদী দর্শনের মূল উৎস হিসেবে অদ্বৈত বেদান্ত : মানবতাবাদের মূল কথাই হল জীবরূপে সকল মানুষের ওপরই গুরুত্ব দেওয়া , সকল মানুষকেই ভালবাসা । মানুষের সামগ্রিক মঙ্গল চিন্তা তাই মানবতাবাদ থেকেই নিঃসৃত । রবীন্দ্রনাথ অদ্বৈত বেদান্তের ভাবধারায় এক ও অদ্বিতীয় ব্রত্মের প্রকাশ হিসেবে মানুষের ওপরই সবিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন । মানুষের অস্তিত্ব ও মর্যাদা তাই তার কাছে সবার ঊর্বে । অদ্বৈত বেদান্তের মূলকথাই হল — জীব ব্রহ্মস্বরূপ । সেকারণেই তিনি যেখানেই মানুষ ও মনুষ্যত্বের অবমাননা দেখেছেন , সেখানেই তিনি প্রতিবাদে মুখর হয়েছেন । 


[ 2 ] মানবতাবাদী দর্শনের ধর্মীয় ভিত্তি : মানুষের জীবন ইতিহাস পর্যালােচনা করলে দেখা যায় যে ,ধর্মের বিষয়টি মানুষের জীবনের সঙ্গে ওতপ্রােতভাবে জড়িয়ে আছে । এমন কোনাে মনুষ্যসমাজ সমাজ দেখা যায় না , যেখানে ধর্মের বিষয়টি একেবারেই অনুপস্থিত । মানুষ এবং মানুষের সমাজকে জানতে গেলে তাই ধর্মের ইতিহাসটিও জানা দরকার । প্রখ্যাত পাশ্চাত্য দার্শনিক ম্যাক্সমুলার-কে অনুসরণ করে বলা যায় —মানুষের প্রকৃত ইতিহাস হল ধর্মের ইতিহাস । রবীন্দ্রনাথও মানুষের জীবন থেকে ধর্মের বিষয়টিকে বাদ দিতে চাননি । তবে তিনি ধর্ম বলতে চিরাচরিত বা প্রথাগত ধর্মকে না বুঝিয়ে ধর্ম হিসেবে মানবতাবাদের বিষয়টিকেই সূচিত করেছেন । সুতরাং বলা যায় যে , রবীন্দ্রনাথের মানবতাবাদী দর্শনের ক্ষেত্রে এক ধর্মীয় ভিত্তিও উপস্থিত ।


[ 3 ] মানবতাবাদী দর্শনের ভিত্তি হিসেবে জীবভাব ও বিশ্বভাব : মানবতাকে মানুষের ধর্মরূপে উল্লেখ করতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথ প্রত্যেকটি মানুষের মধ্যে দুটি সত্তার উল্লেখ করেছেন । এই দুটি সত্তার একটি হল জীবসত্তা এবং অপরটি হল মানবসত্তা 
। জীবসত্তা থেকে উৎসারিত হয় জীবভাব এবং মানবসত্তা থেকে উৎসারিত হয় বিশ্বভাব । স্বার্থযুক্ত মানুষের চিন্তাই হল তার জীবভাব । কিন্তু স্বার্থযুক্ত চিন্তাকে অতিক্রম করে সামগ্রিকভাবে মানুষের চিন্তার মধ্যেই ফুটে ওঠে তার বিশ্বভাব । জীবভাবকে অতিক্রম করে বিশ্বভাবের মাধ্যমেই মানুষ মানবতাবাদের পূজারিরূপে গণ্য হতে পারে । 


[ 4 ] মানবতাবাদের ভিত্তিরূপে শ্রেষ্ঠমানব চেতনা : রবীন্দ্রনাথের মতে , মানুষই হল শ্রেষ্ঠ জীব । মানুষের চেতনাই তাই সর্বশ্রেষ্ঠ চেতনারূপে গণ্য । এরূপ চেতনাই মানুষকে পরিপূর্ণভাবে মেলে ধরতে পারে । মানবতাবাদের অর্থই হল তাই যা মানুষের জীবনের পরিপূর্ণ বিকাশ ঘটাতে পারে । এরূপ বিকাশের ফলে মানুষ আর নিজের ক্ষুদ্র চেতনায় আবদ্ধ থাকতে পারে না । এরই ফলে ক্ষুদ্র চেতনার গন্ডি পেরিয়ে আদর্শ মানুষ হিসেবে মানুষের জয়গান শােনা যায় । এ হল এমনই শ্রেষ্ঠতা যা ব্যক্তিমানুষকে তার ক্ষুদ্র সীমানার বাইরে নিয়ে গিয়ে পরমসত্তার চেতনার দ্বারে হাজির করে ।






বৃহস্পতিবার, ৪ আগস্ট, ২০২২

অভিজ্ঞতাবাদ কাকে বলে ? জ্ঞানের উৎস সম্পর্কে অভিজ্ঞতাবাদের মূল বক্তব্যগুলি আলােচনা করাে ।

একাদশ শ্রেণী দর্শন প্রশ্নোত্তর xi class 11 philosophy Question answer অভিজ্ঞতাবাদ কাকে বলে জ্ঞানের উৎস সম্পর্কে অভিজ্ঞতাবাদের মূল বক্তব্যগুলি আলােচনা করাে abhigatbad kake bole gganer utsoho somporke abhigottabader mul boktboguli alochona koro


উত্তর : জ্ঞানের উৎস সম্পর্কিত মতবাদের পরিপ্রেক্ষিতে যে সমস্ত মতবাদের উল্লেখ করা যায়, তাদের মধ্যে অভিজ্ঞতাবাদ হল একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মতবাদ । অভিজ্ঞতাবাদ মূলত বুদ্ধিবাদের একটি বিরােধী মতবাদরূপেই গণ্য । অভিজ্ঞতাবাদের মূল বক্তব্য হল ,আমাদের ইন্দ্রিয় সংবেদন তথা অভিজ্ঞতাই হল জ্ঞানের একমাত্র উৎস । অভিজ্ঞতা বাদ বুদ্ধি বা প্রজ্ঞাকে বর্জন করে শুধুমাত্র ইন্দ্রিয় সংবেদন তথা অভিজ্ঞতাকেই জ্ঞানের মৌল উৎসরূপে দাবি করে । অভিজ্ঞতাবাদের সমর্থকদের বলা হয় অভিজ্ঞতাবাদী । 

[         ] চরমপন্থী বা নরমপন্থী যাই হােক না কেন , সমস্ত অভিজ্ঞতাবাদী দার্শনিকদের বক্তব্যের মধ্যেই কয়েকটি মূল সুর ধ্বনিত হয় ৷ সেগুলিকেই অভিজ্ঞতাবাদের মূল প্রতিপাদ্য বিষয়রূপে গণ্য করা হয় । অভিজ্ঞতাবাদের মুখ্য প্রতিপাদ্য বিষয়গুলি নীচে উল্লেখ করা হল । 



[         ] জ্ঞানের মুখ্য উৎস হিসেবে অভিজ্ঞতা : অভিজ্ঞতাবাদ অনুযায়ী ইন্দ্রিয় সংবেদন তথা অভিজ্ঞতাই হল জ্ঞানের মুখ্য উৎস । এই ইন্দ্রিয়ানুভবকে বাদ দিয়ে কখনােই জ্ঞান লাভ করা যায় না । অভিজ্ঞতাবাদীদের মতে , বিশুদ্ধ প্রজ্ঞা বা বুদ্ধি বলে স্বতন্ত্র কোনাে বিষয় নেই । বাস্তবের সমস্ত জ্ঞানই অভিজ্ঞতানির্ভর । 


[          ] জ্ঞানের একমাত্র পদ্ধতি হিসেবে আরােহাত্মক পদ্ধতি : অভিজ্ঞতাবাদ অনুযায়ী জ্ঞানের একমাত্র পদ্ধতি হল আরােহাত্মক পদ্ধতি , কখনােই অবরােহাত্মক পদ্ধতি নয় । কারণ , আমরা অভিজ্ঞতার মাধ্যমে বিশেষ বিশেষ ঘটনাকে পর্যবেক্ষণ ও পরীক্ষা করে একটি সাধারণ সূত্র বা ধারণায় উপনীত হই । সুতরাং , সমস্তপ্রকার সামান্য ধারণাকেই অভিজ্ঞতার মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা সম্ভব ।



[        ] সহজাত ধারণার বিষয়টিকে বর্জন : অভিজ্ঞতাবাদী দার্শনিকগণ বুদ্ধিবাদের মূলভিত্তি অর্থাৎ সহজাত ধারণার বিষয়টিকে নস্যাৎ করেছেন । তাদের মতে , সহজাত ধারণা বলে কোনাে কিছুই থাকতে পারে না । কারণ , সহজাত ধারণার বিষয়কে কখনােই ইন্দ্রিয় সংবেদনের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা যায় না । তাদের মতে, আমাদের সমস্ত ধারনাই প্রাপ্ত হয় ইন্দ্রিয় অভিজ্ঞতার মাধ্যমে । তারা আরও দাবি করেন যে, জন্মাবার সময় আমাদের মন থাকে সাদা কাগজের মতাে । অভিজ্ঞতার দ্বারাই সেখানে সমস্ত ধারণা মুদ্রিত হয় , অন্য কোনাে উপায়ে নয় । সুতরাং সহজাত ধারণা তথা আন্তর ধারণার বিষয়টি অবশ্যই পরিত্যাজ্য । 

[         ] অভিজ্ঞতাবাদীদের স্বীকার্য বাক্য : অভিজ্ঞতাবাদী দার্শনিকগণ দু-ধরনের বাক্যকে স্বীকার করে নিয়েছেন— [i] বিশ্লেষক এবং [ii] সংশ্লেষক । যে সমস্ত বাক্য বিশ্লেষকরূপে গণ্য,তা অবশ্যই পূর্বতঃসিদ্ধ হবে । আবার যে সমস্ত বাক্য সংশ্লেষকরূপে গ্রাহ্য, তা অবশ্যই পরতঃসাধ্যরূপে গণ্য হবে । এ দুটি ছাড়া তৃতীয় কোনাে প্রকার বাক্যকে অভিজ্ঞতাবাদীরা স্বীকার করেন না । বুদ্ধিবাদীরা যে পূর্বতঃসিদ্ধ সংশ্লেষক বচনের উল্লেখ করেছেন , তাকে অভিজ্ঞতাবাদীরা বর্জন করেছেন ।



[          ] মূল্যের বাস্তব সত্তাকে অস্বীকার : অভিজ্ঞতাবাদীরা দাবি করেন যে, মূল্যের কোনাে বাস্তব সত্তা নেই । তারা সত্য , শিব ও সুন্দর রূপ মূল্যকে অস্বীকার করেছেন এবং পরমমূল্যের বিষয়কে নিছক কল্পনারূপে অভিহিত করেছেন । কারণ , ইন্দ্রিয় সংবেদন দ্বারা এই সমস্ত মূল্যের মূল্যায়ন কখনােই সম্ভব নয় ।

[           ] অধিবিদ্যাকে অস্বীকার : অভিজ্ঞতাবাদী দার্শনিকগণ অধিবিদ্যাকে অর্থহীনরূপে উল্লেখ করেছেন । তাঁদের মতে , অধিবিদ্যার জ্ঞান কখনােই ইন্দ্রিয় সংবেদনের মাধ্যমে লভ্য নয় । সেকারণেই তারা অধিবিদ্যাকে অসম্ভব , উদ্ভট ও আজগুবিরূপে উল্লেখ করেছেন এবং অধিবিদ্যক বাক্যসমূহকে অর্থহীনরূপে গণ্য করেছেন । 



[         ] জ্ঞানতাত্ত্বিক মতবাদ হিসেবে অভিজ্ঞতাবাদ শুধুমাত্র ইন্দ্রিয় সংবেদন তথা অভিজ্ঞতার ওপরই গুরুত্ব আরােপ করেছে । বুদ্ধিবাদের বিরােধী মতবাদরূপে গণ্য হওয়ায় তা বুদ্ধি বা প্রজ্ঞার বিষয়টিকে অস্বীকার করেছে । এর ফলে তা একদেশদর্শিতার দোষে দুষ্ট হয়েছে । কিন্তু জ্ঞানােৎপত্তির ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতা ছাড়া বুদ্ধিরও যে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে , তা আদৌ অস্বীকার করা যায় না । বরং এই দাবি করা সংগত যে , জ্ঞানােৎপত্তির ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতার যতটা ভূমিকা আছে , বুদ্ধিরও ঠিক ততটাই ভূমিকা রয়েছে ।সুতরাং জ্ঞানের উৎপত্তির ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতাবাদ কখনােই একটি পূর্ণাঙ্গ মতবাদরূপে গণ্য হয় না ।







বুধবার, ৩ আগস্ট, ২০২২

‘ জানা ’ শব্দটি কী কী অর্থে ব্যবহার করা হয় ?

একাদশ শ্রেণী দর্শন প্রশ্নোত্তর xi class 11 philosophy Question answer জানা শব্দটি কী কী অর্থে ব্যবহার করা হয় jana sobdoti ki ki arthe babohar kora hoi

উত্তর :  জ্ঞানের প্রকৃতি বা স্বরূপকে যথাযথভাবে উপলব্ধি করতে হলে ‘জানা’ শব্দটির বিভিন্ন অর্থ ও প্রয়ােগ সম্পর্কে আমাদের সচেতন থাকা উচিত । আমরা আমাদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় ‘জানা ’ ক্রিয়াপদটিকে বিভিন্ন অর্থে প্রয়ােগ করে থাকি । এই ‘ জানা’ বা ‘জ্ঞান’ শব্দটি যেসব অর্থে প্রযুক্ত হতে পারে , তা নীচের উদাহরণগুলি থেকে প্রমাণিত –

[ 1 ] আমি একাদশ শ্রেণির ছাত্র রাম রায়কে জানি ।

[ 2 ] আমি মােটরগাড়ি চালাতে জানি । 

[ 3 ] আমি জানি যে পৃথিবী সূর্যের চারিদিকে ঘােরে ।

[         ] এই তিনটি উদাহরণে ‘জানা ’ শব্দটি প্রযুক্ত হলেও তিনটি ক্ষেত্রেই ‘জানা ’ শব্দটি কখনােই একই অর্থে প্রযুক্ত হয়নি । কারণ , প্রথম উদাহরণটির ক্ষেত্রে ‘ জানা’ শব্দটি ‘পরিচিতি অর্থে’ বােঝানাে হয়েছে । দ্বিতীয় উদাহরণটির ক্ষেত্রে জানা পদটি ‘কর্মকুশলতার অর্থে’ প্রযুক্ত হয়েছে । আর তৃতীয় উদাহরণটির ক্ষেত্রে জানা পদটি একটি সত্য ঘটনাকে ভাষায় উপস্থাপিত করার অর্থে তথা ‘ বাচনিক অর্থে উল্লেখ করা হয়েছে । জানার এই ত্রিবিধ অর্থকে নীচে পর্যায়ক্রমিকভাবে সংক্ষেপে আলােচনা করা হল – 

[ 1 ] পরিচিতি অর্থে জানা : আমাদের প্রাত্যহিক অভিজ্ঞতায় দেখা যায় যে, কোনাে প্রকারের পরিচিতি অর্থে ‘জানা ’ ক্রিয়াপদটি ব্যবহৃত হয় । এরূপ অর্থে ‘ জানা ’ শব্দটির অর্থ হল সাক্ষাৎ পরিচিতি । কোনাে ব্যক্তি বা বস্তু সম্পর্কে আমাদের যদি কোনাে সাক্ষাৎ পরিচিতি বা অভিজ্ঞতা থাকে , তাহলে আমরা ওই ব্যক্তি বা বস্তুকে চিনি বা জানি বলে দাবি করতে পারি । যেমন — ‘আমি একাদশ শ্রেণির ছাত্র রাম রায়কে চিনি বা জানি ’, ‘আমি মন্দিরা রায় কে চিনি বা জানি’ ইত্যাদি । এভাবে জানার মাধ্যমে কখনােই জানার সামগ্রিক অর্থটি পরিস্ফুট হয় না । শুধুমাত্র জানার একটি দিকই উন্মােচিত হয় । সুতরাং , এই অর্থে জানাই কিন্তু সব জানা নয় । 



[ 2 ]কর্মকুশলতার অর্থে জানা : ‘জানা’ শব্দটির অপর একটি অর্থ হল ‘কর্মকুশলতার অর্থ ’ । এই ধরনের জ্ঞানের ক্ষেত্রে ‘ জানা’ শব্দটির মাধ্যমে কোনাে কর্মকুশলতা তথা কর্মনৈপুণ্যকেই বােঝানাে হয়ে থাকে । এরূপ জানার মাধ্যমে কোনাে কাজ করার ক্ষমতা তথা দক্ষতাকেই সূচিত করা হয় । যেমন —‘ আমি মােটরগাড়ি চালাতে জানি ’ ,‘ আমি সাঁতার কাটতে জানি ইত্যাদি । এই সমস্ত ক্ষেত্রে কীভাবে মােটরগাড়ি চালাতে হয় তার কৌশলটি আমার জানা আছে , অথবা কীভাবে সাঁতার কাটতে হয় তার প্রক্রিয়াটি আমার জানা আছে — তা বােঝানাে হয়েছে । 

[ 3 ] বাচনিক অর্থে জানা : এক্ষেত্রে ‘ জানা ’ শব্দটিকে বাচনিক জ্ঞানের অর্থে উল্লেখ করা হয়েছে । জ্ঞানের বা জানার যে তিনপ্রকার অর্থ বা ব্যবহারের উল্লেখ করা হয়েছে , তাদের মধ্যে এই বাচনিক জ্ঞানই হল সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ । এরূপ অর্থে ‘ জানা ’ হল একটি বচনকে জানা এবং সেই বচনটিকে সত্য বলে জানা । আমরা যদি কোনাে নির্দিষ্ট ঘটনামূলক বৈশিষ্ট্যকে জানি এবং যদি এটাও জানি যে, ওই বৈশিষ্ট্যটি কোনাে -এক ঘটনার মধ্যে বর্তমান , তাহলে আমরা সেক্ষেত্রে জানার যে অর্থটিকে প্রয়ােগ করি , তা হল তার বাচনিক অর্থ । যেমন— ‘ আমি জানি যে পৃথিবী সূর্যের চারিদিকে ঘােরে ’, ‘আমি জানি যে রবীন্দ্রনাথ সাহিত্যে নােবেল প্রাইজ পেয়েছেন’ ইত্যাদি । এই অর্থে জানার বিষয়টিকে সর্বদাই একটি বচনের আকারে উপস্থাপিত করা হয় । বাচনিক অর্থে জানার বিষয়টি সর্বদাই সত্য অথবা মিথ্যারূপে নির্ণীত হতে পারে । দর্শনের ক্ষেত্রে এই বাচনিক জ্ঞানের ওপরই সবিশেষ গুরুত্ব আরােপ করা হয়েছে ।








মঙ্গলবার, ২ আগস্ট, ২০২২

বাচনিক জ্ঞানের বিভিন্ন শর্ত কী ? বাচনিক জ্ঞানের আবশ্যিক ও পর্যাপ্ত শতগুলি উল্লেখ করো ।

একাদশ শ্রেণী দর্শন প্রশ্নোত্তর xi class 11 philosophy Question answer বাচনিক জ্ঞানের বিভিন্ন শর্ত কী বাচনিক জ্ঞানের আবশ্যিক ও পর্যাপ্ত শতগুলি উল্লেখ করো bachonik gganer bivinno shotto ki bachonik gganer aboshik o porjapto shottoguli ullekh koro


উত্তর : দর্শনের ক্ষেত্রে আমরা জ্ঞান বলতে মূলত বাচনিক জ্ঞানকেই বুঝে থাকি । কিন্তু প্রশ্ন হল, কোন্ কোন্ শর্ত উপস্থিত থাকলে বাচনিক জ্ঞান লাভ করা যায় ? অথবা বলা যেতে পারে যে, বাচনিক জ্ঞানের কোন্ কোন্ শর্তগুলির মধ্যে একটিও অনুপস্থিত থাকলে জ্ঞান লাভ করা সম্ভব হবে না ? অথবা বলা যায় যে , পর্যাপ্ত শর্তের পরিপ্রেক্ষিতে কোন কোন শর্ত উপস্থিত থাকলে বাচনিক জ্ঞান লাভ করা হবেই ? আরও সহজ করে বলা যায় , বাচনিক জ্ঞানের আবশ্যিক  ও পর্যাপ্ত  শর্তগুলি কী ? 

[       ] ধরা যাক , P হল একটি বচন । এই P নামক বচনটিকে জানার পশ্চাতে কতকগুলি শর্ত থাকে । এই শর্তগুলির পরিপ্রেক্ষিতেই আমরা P নামক বচনটিকে জেনেছি । এ প্রসঙ্গে জন হসপার্স উল্লেখ করেন যে ,কোনাে বচন যথা P- কে সত্য বলে জানতে গেলে তিনটি শর্তকে অবশ্যই পূরণ করতে হয় । এই তিনটি শর্ত হল যথাক্রমে –

[ 1 ] P নামক বচনটি অবশ্যই সত্য হবে । 

[ 2 ] P নামক বচনটির সত্যতায় জ্ঞাতার বিশ্বাস থাকতে হবে । এবং 

[ 3 ] P নামক বচনটি যে সত্য, তার সমর্থনে পর্যাপ্ত সাক্ষ্যপ্রমাণ বা যুক্তি থাকতে হবে । 

[       ]  প্রথম শর্তটির পরিপ্রেক্ষিতে আমরা যখন কোনাে বিষয় বা বচনকে জানি বলে দাবি করি , তখন সেই বচনটিকে অবশ্যই সত্য হতে হবে । কারণ , ওই বচনটি যদি বাস্তবে মিথ্যারূপে গণ্য হয়, তবে তাকে আমরা জেনেছি বলে কখনোই দাবি করতে পারি না । ‘এরূপ পর্তের পরিপ্রেক্ষিতে তাই বাচনিক জ্ঞানের বিষয়টিকে নীচের উদাহরনের সাহায্যে উপস্থাপিত করা যায় –


            S জানে  P কে । 
          
            : P হয় সত্য । অথবা P নয় সত্য । 
           
            : S জানে না P কে ।
          
 [       ]  বাচনিক জ্ঞানের দ্বিতীয় শর্তের পরিপ্রেক্ষিতে আমরা যখন কোনাে বচন (P) কে জানি বলে দাবি করি , তখন বচনটিকে শুধুমাত্র সত্য হলেই হবে না, বচনটির সত্যতায় জ্ঞাতার বিশ্বাসও থাকতে হবে । এরূপ শর্তের পরিপ্রেক্ষিতে তাই বাচনিক জ্ঞানের  বিষয়টিকে নীচের উদাহরণের সাহায্যে উপস্থাপিত করা যায় –
 
          S জানে যে P সত্য । 
          
          : S বিশ্বাস করে যে P সত্য ।
 
[ 3 ] বাচনিক জ্ঞানের তৃতীয় শর্তের পরিপ্রেক্ষিতে কোনাে একটি বচন হয়তাে সত্য হতে পারে , আবার ওই বচনটির সত্যতায় জ্ঞাতার বিশ্বাসও থাকতে পারে কিন্তু তা সত্বেও বচনটি কখনােই জ্ঞানের মর্যাদা লাভ করতে পারে না । কারণ , এরূপ বিশ্বাসের সমর্থনে উপযুক্ত তথ্য বা সাক্ষ্যপ্রমান চাই । উপযুক্ত সাক্ষ্যপ্রমাণ ছাড়া বচনটির ক্ষেত্রে কোনাে নিশ্চয়তা থাকে না । এভাবেই আমরা বলতে পারি যে , তথ্যনিষ্ঠ সত্যবিশ্বাসই হল জ্ঞান । সুতরাং জ্ঞানের বিষয়টিকে নীচের আকারে উপস্থাপিত করা যায় – জ্ঞান বা জানা = সত্যতা + বিশ্বাস + যথার্থ সাক্ষ্যপ্রমাণ বা তথ্যপ্রমাণ । 
[         ]  বাচনিক জ্ঞানের ক্ষেত্রে ওপরের যে তিনটি শর্তের উল্লেখ করা হয়েছে , তাদের প্রত্যেকটি শর্তই জানার ক্ষেত্রে আবশ্যিক শর্তরূপে গণ্য হয় । কারণ , এই তিনটি শর্তের একটিও যদি অনুপস্থিত থাকে ,তাহলে কখনােই জ্ঞান অর্জন সম্ভব নয় । আর যে শর্তের অনুপস্থিতির ফলে জ্ঞানটিরও অনুপস্থিতি ঘটে , তাকেই বলা হয় অবিশ্যিক শর্ত । অপরদিকে , বাচনিক জ্ঞানের ক্ষেত্রে কেবল এই তিনটি শর্ত থাকলেই জ্ঞানলাভ হতে পারে বলে এদের একসঙ্গে বলা হয় জানার বা জ্ঞানের পর্যাপ্ত শর্ত ।



সোমবার, ১ আগস্ট, ২০২২

কর্মযােগের আদর্শ কী ? আলোচনা করো ।

একাদশ শ্রেণী দর্শন প্রশ্নোত্তর xi class 11 philosophy Question answer কর্মযােগের আদর্শ কী আলোচনা করো kormoyoger adorsho ki alochona koro


উত্তর : স্বামী বিবেকানন্দ ১৮৯৬ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত তার কর্মযােগ গ্রন্থে কর্ম সম্বন্ধে বিশদে আলােচনা করেছেন । তিনি কর্মযোগের মাধ্যমেই আমাদের মুক্তিলাভের কথা বলেছেন ।
[ 1 ] মুক্তিই জীবনের চরম লক্ষ্য : বেদান্ত ধর্মের মহানভাব এই যে , আমরা বিভিন্ন পথে সেই একই চরম লক্ষ্যে উপনীত হই । এই পথগুলি হল— কর্ম , ভক্তি,যােগ ও জ্ঞানের পথ । কিন্তু এ কথা অবশ্যই মনে রাখা দরকার যে , এই সমস্ত পথ কখনােই বাঁধাধরা কিছু নয় এবং অত্যন্ত পৃথকও নয় । একটি অন্যগুলির সঙ্গে অত্যন্ত সহজেই মিশে যেতে পারে ।এমন কোনাে লোকই দেখা যায় না, যার কর্ম করার শক্তি ব্যতীত আর অন্য কিছু নেই । এমন কোনাে ভক্ত নেই, যার ভক্তি ছাড়া আর কিছুই নেই । আবার এমন কোনাে ব্যক্তি নেই , যার জ্ঞান ছাড়া আর কিছুই নেই । এই ধরনের বিভাগ কেবলমাত্র মানুষের গুণ বা প্রবণতার প্রাধান্য অনুযায়ীই করা হয় । কিন্তু শেষপর্যন্ত এই চারটি পথ একই ভাবের অভিমুখে মিলিত হয় । এই চরম ভবিটি হল মানুষের মােক্ষ বা মুক্তি । 

[ 2 ] কর্মযােগ মােক্ষলাভের এক নীতি ও প্রণালী : প্রত্যেকটি ধর্মেই মুক্তির জন্য প্রাণপণ চেষ্টার বিষয়টি আমরা লক্ষ করি । এ হল সমুদয় নীতি ও নিঃস্বার্থপরতার ভিত্তি । নিঃস্বার্থপরতার অর্থ হল আমি কেবলই আমার এই শরীর — এই ভাব থেকে মুক্ত হওয়া । মানুষ তখন অনন্তস্বরূপ হয়ে যায় । এই অনন্ত বিস্তৃতিই হল সকল ধর্মের, সকল নীতি শিক্ষার এবং দর্শনের মূল লক্ষ্য । নিঃস্বার্থ কর্ম দ্বারা মুক্তি লাভ করাই হল কর্মযােগ । সুতরাং প্রত্যেক স্বার্থপূর্ণ কার্যই আমাদের সেই লক্ষ্যে পৌঁছােনাের পথে বাধাস্বরূপ । আর নিঃস্বার্থভাবে কর্মই আমাদেরকে সেই লক্ষ্যে টেনে নিয়ে যায় । সেকারণেই স্বামী বিবেকানন্দ নৈতিকতার সংজ্ঞায় বলেছেন , যা স্বার্থশূন্য তাই নীতিসংগত , আর যা স্বার্থযুক্ত তাই নীতিবিরুদ্ধ । সুতরাং , কর্মযােগ হল নিঃস্বার্থপরতা ও সৎকর্ম দ্বারা মুক্তি লাভ করার এক নীতি ও প্রণালী । 

[ 3 ] কর্মযােগের একমাত্র উদ্দেশ্য হিসেবে নিরন্তরভাবে নিষ্কাম কম : কর্মযােগীর কোনাে নির্দিষ্ট ধর্মমতে বিশ্বাস করার আবশ্যকতা নেই । তিনি ঈশ্বর বিশ্বাসী হন বা না-হন ,তাতে কিছুই যায় আসে না । তাকে কোনাে মতবাদের সাহায্য না নিয়েও , কেবলমাত্র কর্ম দ্বারা সমস্যার সমাধান করতে হয় । স্বামী বিবেকানন্দ তাই তার কর্মযােগে বলেছেন যে , জগৎযন্ত্রের চক্র থেকে পালিয়ে না গিয়ে , এর ভিতরে থেকেই কর্মের রহস্য সম্বন্ধে শিক্ষা নিতে হবে । জগৎযন্ত্ররূপ চক্রের মধ্য দিয়েই আমাদের মুক্তির দিকে এগিয়ে যেতে হবে । এক্ষেত্রে তাই একমাত্র উপায় হল অনাসক্ত হয়ে , সমুদয় কর্মের ফল ত্যাগ করে ,নিষ্কামভাবে নিরন্তর কর্ম করা । আর এখানেই কর্মযােগের আদর্শটি নিহিত । 


[ 4 ] প্রকৃত কর্মযােগীরূপে বুদ্ধদেব : বিবেকানন্দ এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করেছেন বুদ্ধদেবের কথা , যিনি কর্মযােগের আদর্শকে কার্যে পরিণত করেছেন । বিবেকানন্দ বলেন যে , বুদ্ধ ব্যতীত জগতের অন্যান্য মহাপুরুষগণ বাহ্য প্রেরণার বশেই নিঃস্বার্থ কর্মে প্রবৃত্ত হয়েছেন । বহির্জগৎ থেকেই তারা পুরস্কার আশা করেছেন । কিন্তু একমাত্র বুদ্ধদেবই অন্তরের প্রেরণা থেকে নিঃস্বার্থভাবে কর্ম করেছেন । তিনি ঈশ্বর বা আত্মতত্ত্বে মাথা ঘামাননি , তিনি শুধুমাত্র সকলকে সৎকর্ম করার পরামর্শ দিয়েছেন । তিনি আরও বলেছেন যে , মানুষের সৎকর্মই মানুষকে মুক্তি দেবে । বুদ্ধদেব একজন দার্শনিক হয়েও , তুচ্ছতম ও নিম্নতম প্রাণীর জন্যও সহানুভূতি প্রকাশ করেছেন । নিজের জন্য তিনি কিছুই দাবি করেননি । প্রকৃতপক্ষে তিনিই হলেন আদর্শ কর্মযােগী । বিবেকানন্দ তাই বলেন যে, অভিসন্ধি ছাড়া যিনি কর্ম করেন , তিনি একজন বুদ্ধদেবে পরিণত হন এবং কর্মযােগের প্রকৃত আদর্শকে বহন করেন । এরূপ ব্যক্তিই হলেন কর্মযােগের চরম আদর্শের দৃষ্টান্ত ।






রবিবার, ৩১ জুলাই, ২০২২

ন্যায়মতে ব্যাপ্তি কাকে বলে ? ব্যাপ্তি জ্ঞানের উপায়গুলি কী কি ?

একাদশ শ্রেণী দর্শন প্রশ্নোত্তর xi class 11 philosophy Question answer ন্যায়মতে ব্যাপ্তি কাকে বলে ব্যাপ্তি জ্ঞানের উপায়গুলি কী কি nnaymote bapti kake bole bapti gganer upayguli ki ki


উত্তর : ব্যাপ্তি শব্দটির আক্ষরিক অর্থ হল ব্যাপকতা বা বিস্তৃতি । এই ব্যাপকতা বা বিস্তৃতি হল পদের ব্যাপকতা । একটি পদ ব্যাপক হতে পারে , আবার তা ব্যাপ্যও হতে পারে । যার দ্বারা ব্যাপ্ত হয় , তাকেই বলা হয় ব্যাপক , আর যা ব্যাপ্ত হয় তাকেই বলা হয় ব্যাপ্য । ব্যাপ্তি হল এই ব্যাপ্য ও ব্যাপকের মধ্যে একপ্রকার সম্বন্ধ । অনুমানের ক্ষেত্রে হেতু তথা ধোঁয়াকে বলা হয় ব্যাপ্য আর সাধ্য তথা আগুনকে বলা হয় ব্যাপক । 

[           ] সহচর নিয়মরূপে ব্যাপ্তি : ন্যায়দর্শনে ব্যাপ্তিকে ব্যাপ্য ও ব্যাপকের মধ্যে সহচর নিয়মরূপে উল্লেখ করা হয়েছে । ব্যাপ্তির প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে সাধ্য ও হেতুর সহচর দর্শন খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয় । দুটি বিষয় যদি সহগামী হয় , তবে তাদের সম্বন্ধকে বলা হয় সহচর সম্বন্ধ । হেতু ও সাধ্য সহগামী বলেই এদেরকে সহচররূপে উল্লেখ করা হয়েছে । এই দুটি সহচারের অন্তঃস্থিত সম্বন্ধকেই বলা হয় সহচর নিয়ম । এরূপ সহচর নিয়মই হল ব্যাপ্তি । সুতরাং , ‘যেখানে যেখানে ধোঁয়া আছে , সেখানে সেখানে আগুন আছে ’ — এরূপ হেতু ও সাধ্যের সহচার নিয়মকেই বলা হয় ব্যাপ্তি সম্বন্ধ । 


[           ]  ব্যাপ্তিগ্রহের উপায় কী ? অর্থাৎ, কীভাবে ব্যাপ্তি সম্বন্ধের জ্ঞান প্রতিষ্ঠা করা যায় ? এরূপ প্রশ্নের উত্তরে নৈয়ায়িকগণ নীচের পদ্ধতিগুলির উল্লেখ করেছেন 

[            ] অম্বয় : ‘অন্বয়’ শব্দটির অর্থ হল মিল বা সাদৃশ্য । দুটি বিষয়ের একসঙ্গে উপস্থিতিই হল অন্বয় । ধোঁয়া এবং আগুন — এ দুটিই যদি একসঙ্গে উপস্থিত হয় ,তাহলে দাবি করা যায় যে ,ধোঁয়া এবং আগুনের মধ্যে অন্বয় বা মিল আছে । এরই পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায় যে —যেখানে যেখানে ধোঁয়া আছে , সেখানে সেখানে আগুন আছে । আর এরূপ অন্বয়মূলক সম্বন্ধের পরিপ্রেক্ষিতে উল্লেখ করা যায় যে , ধোঁয়া ও আগুনের (হেতু ও সাধ্যের ) মধ্যে ব্যাপ্তি সম্বন্ধ আছে । 



[             ] ব্যতিরেক : ব্যাপ্তি জ্ঞানের উপায় হিসেবে ব্যতিরেকের কথা নৈয়ায়িকেরা বলেছেন । ব্যতিরেক শব্দটির অর্থ হল দুই বিষয়ের একত্র অনুপস্থিতি । অর্থাৎ , একটি না থাকলে ,অন্যটিও থাকে না । এই ব্যতিরেক নিয়মের সাহায্যেই আমরা বলতে পারি যে, যেখানে যেখানে ধোঁয়া নেই , সেখানে সেখানে আগুনও নেই । এরূপ ব্যতিরেক সহচর সম্বন্ধের পরিপ্রেক্ষিতেই দাবি করা যায় যে ,ধোঁয়া এবং  আগুনের ( হেতু ও সাধ্যের ) মধ্যে ব্যাপ্তি সম্বন্ধ প্রতিষ্ঠিত হতে পারে । 


[            ] ব্যভিচারাগ্রহ : ব্যভিচার শব্দটির অর্থ হল নিয়মবিরুদ্ধ বিপরীত দৃষ্টান্ত । আর আগ্রহ শব্দটির অর্থ হল অদর্শন । অর্থাৎ ,যে দুটি ঘটনার মধ্যে ব্যাপ্তি তথা সহচর সম্বন্ধ প্রতিষ্ঠা করা হয় , তাদের মধ্যে এমন কোনাে নিয়মবিরুদ্ধ বিপরীত দৃষ্টান্ত দেখা যাবে না —যেখানে একটি আছে , অথচ অন্যটি নেই । ধোঁয়া আছে অথচ আগুন নেই এমনটি তাই হতে পারে না । ব্যাপ্তি জ্ঞানের এরূপ শর্তটিকেই বলা হয় ব্যভিচারাহ (ব্যভিচার + অগ্রহ ) । 




[           ] উপাধি নিরাস : ব্যাপ্তি সম্বন্ধের ক্ষেত্রে কোনাে উপাধি তথা শর্ত থাকে না । উপাধি শব্দের অর্থ হল শর্ত এবং নিরাস শব্দের অর্থ হল হীন বা নাই । দুটি বিষয়ের মধ্যে যে কোনাে প্রকার শর্ত নেই , এমন নিশ্চিত হলে তবেই ওই দুটি বিষয়ের মধ্যে ব্যাপ্তি সম্বন্ধ আছে বলে মানা যাবে । দুটি বিষয়ের মধ্যে যে নাই ( উপাধি নিরাস ) তা, জানা যায় বারংবার একই বিষয়ের দর্শন অর্থাৎ ভূয়ােদর্শনের মাধ্যমে । দুটি বিষয় শর্তহীন হলে তবেই তাদের মধ্যে ব্যাপ্তি সম্বন্ধ প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব । 


[          ] তর্ক : ব্যাপ্তি সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার আরও একটি উপায় বা শর্ত হিসেবে নৈয়ায়িকগণ তর্ক - কে উল্লেখ করেছেন । ধোঁয়া ও আগুনের মধ্যে যে ব্যাপ্তি সম্পর্ক আছে , বর্তমানকালে প্রত্যক্ষ করা সম্ভব হলেও অতীত বা ভবিষ্যৎকালেও যে সম্ভব হবে , সেই বিষয়ে সংশয় থাকতেই পারে । এই সংশয় নিরসনের জন্যই নৈয়ায়িকগণ তর্কের আশ্রয় গ্রহণ করেছেন । এই তর্ক হল এক প্রকারের আনুমানিক পরােক্ষ পদ্ধতি । এর সাহায্যে মূল প্রতিপাদ্য বিষয়ের বিরুদ্ধ বচনকে অসত্যরূপে প্রমাণ ক'রে পরােক্ষে ওই মূল বাক্যের সত্যতাকেই প্রমাণ করা হয় । এরূপ পদ্ধতির দ্বারা হেতু ও সাধ্যের মধ্যে ব্যাপ্তি জ্ঞান প্রতিষ্ঠিত হতে পারে । 



[          ] সামান্য লক্ষণ প্রত্যক্ষ : ব্যাপ্তি জ্ঞানকে সমস্ত রকম সংশয় থেকে মুক্ত করার প্রয়াসে নৈয়ায়িকগণ সামান্য লক্ষণ প্রত্যক্ষের উল্লেখ করেছেন । এটাই হল ব্যাপ্তি সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার সর্বশেষ স্তর । পূর্বের পাঁচটি পদ্ধতি অবলম্বন করে হেতু ও সাধ্যের মধ্যে যে ব্যাপ্তি সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করা হয়, তাকে নৈয়ায়িকগণ সামান্য লক্ষণ প্রত্যক্ষের মাধ্যমে আরও নিশ্চিত করেছেন ।






শনিবার, ৩০ জুলাই, ২০২২

অলৌকিক সন্নিকর্ষ কাকে বলে ? দৃষ্টান্ত-সহ বিভিন্ন প্রকার অলৌকিক সন্নিকর্ষের আলােচনা করাে ।

একাদশ শ্রেণী দর্শন প্রশ্নোত্তর xi class 11 philosophy Question answer অলৌকিক সন্নিকর্ষ কাকে বলে দৃষ্টান্তসহ বিভিন্ন প্রকার অলৌকিক সন্নিকর্ষের আলােচনা করাে aloukik sonnikorsho kake bole drishtantosoho bivinno prokar aloukik sonnikorsher alochona koro


উত্তর :  ন্যায়দর্শনে প্রত্যক্ষ হল দুরকম— [1 ] লৌকিক ও [2] অলৌকিক । লৌকিক প্রত্যক্ষের ক্ষেত্রে ইন্দ্রিয়ের সঙ্গে বিষয়ের লৌকিক তথা সরাসরি সন্নিকর্ষ হয় , যেমন চক্ষু নামক ইন্দ্রিয়ের সঙ্গে ঘটের সন্নিকর্ষ । অপরদিকে , অলৌকিক প্রত্যক্ষের ক্ষেত্রে ইন্দ্রিয়ের সঙ্গে বিষয়ের অলৌকিক তথা পরােক্ষ সন্নিকর্ষ সম্পন্ন হয় , যেমন — ঘট প্রত্যক্ষের ক্ষেত্রে চক্ষু নামক ইন্দ্রিয়ের সঙ্গে ঘটত্ব জাতির প্রত্যক্ষ ।

অলৌকিক সন্নিকর্ষ হল তিন প্রকার— 

[i ] সামান্য লক্ষণ সন্নিকর্ষ ।

[2] জ্ঞান লক্ষণ সন্নিকর্ষ এবং 

[3] যােগজ লক্ষণ সন্নিকর্ষ । 


[ 1 ]সামান্য লক্ষণ সন্নিকর্ষ : যে প্রত্যক্ষের ক্ষেত্রে বিষয়ের সামান্য ধর্ম তথা জাতিধর্ম সন্নিকর্ষরূপে কাজ করে , তাকেই বলা হয় সামান্য লক্ষণ সন্নিকর্ষ । অর্থাৎ , সামান্য লক্ষণ প্রত্যক্ষের ক্ষেত্রে ইন্দ্রিয়ের সঙ্গে সামান্য জাতি বা সাধারণ ধর্মের সন্নিকর্ষ হয় । এ ক্ষেত্রে সামান্য জাতি বা সাধারণ ধর্মকে কখনােই সরাসরিভাবে প্রত্যক্ষ করা যায় না । সেকারণেই এই ধরনের সন্নিকর্ষ কখনােই লৌকিক বা সরাসরিভাবে সম্পন্ন হতে পারে না । এই ধরনের সন্নিকর্ষ তাই অলৌকিক তথা পরােক্ষভাবেই সম্পন্ন হয় । সে কারণেই এই সামান্য লক্ষণ সন্নিকর্ষকে অলৌকিক সন্নিকর্ষ রুপেও অভিহিত করা হয় । ঘট প্রত্যক্ষর ক্ষেত্রে যখন ঘটত্ব জাতি বা সামান্য ধর্মের প্রত্যক্ষ হয়, তখন এই প্রকার সন্নিকর্ষই সংঘটিত হয় ।

[ 2 ] জ্ঞান সঞ্চণ সন্নিকর্ষ : পূর্বজ্ঞানের ভিত্তিতে কোনো বিষয়কে প্রত্যক্ষ করার ক্ষেত্রে সেই বিষয়ের সঙ্গে ইন্দ্রিয়ের যে অলৌকি সন্নিকর্ষ সম্পন্ন হয়, তাকেই বলা হয় জ্ঞান লক্ষণ সন্নিকর্ষ । এ ক্ষেত্রে বিষয়ের পূর্বজ্ঞানের স্মৃতিই সন্নিকর্ষের কাজ করে । বিষয়টির জ্ঞান আগে থেকেই আমাদের থাকে বলে , এই ধরনের সন্নিকর্ষকে জ্ঞান লক্ষণ সন্নিকর্ষ বলা হয় । এই ধরনের সন্নিকর্ষ সরাসরিভাবে সম্পন্ন নয় ,তা অলৌকিকভাবেই সম্পন্ন । তাই এই জ্ঞান লক্ষণ সন্নিকর্ষকে অলৌকি সন্নিকর্ষ বলা হয় । উদাহরণস্বরূপ উল্লেখ করা যায় যে , নাসিকার দ্বারাই আমরা চন্দনকাঠের সুরভি লৌকিক সন্নিকর্ষের মাধ্যমে পাই এবং বলি যে চন্দন সুরভিযুক্ত । চন্দনের সুরভি তাই নাসিকা নামক ইন্দ্রিয়ের নিজস্ব  বিষয়রূপে গণ্য । কিন্তু চন্দনকাঠ দেখেই তাকে চন্দনকাঠ হিসেবে চিনে নিয়ে যখন আমরা পূর্বজ্ঞানের ভিত্তিতে বলি যে ,চন্দন সুরভিযুক্ত, তখন সেক্ষেত্রে যে প্রকার সন্নিকর্ষ হয় তাকেই বলা হয় জ্ঞান লক্ষণ সন্নিকর্ষ । এ ক্ষেত্রে চক্ষুর সঙ্গে চন্দনের সুরভির সরাসরি বা লৌকিক সন্নিকর্ষ না হয়ে ,অলৌকিকভাবেই সম্পন্ন হয় । সেজন্যই জ্ঞান লক্ষণ সন্নিকর্ষকে অলৌকিক সন্নিকর্ষরূপে গণ্য করা হয় । 

[ 3 ] যােগজ লক্ষণ সন্নিকর্ষ : যােগসাধনার দ্বারা সিদ্ধপুরুষগন অলৌকিক শক্তির অধিকারী হন ৷ এর ফলে তারা অতীত , বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ — এই তিনটি কালের সমস্ত বস্তুই প্রত্যক্ষ করতে পারেন । এই ধরনের প্রত্যক্ষ সম্ভব হয় যােগজ সন্নিকর্ষের দ্বারা । যােগজ সন্নিকর্ষের ক্ষেত্রে অতীন্দ্রিয় বিষয়ের প্রত্যক্ষ হয় । এই অতীন্দ্রিয় বিষয়কে কখনােই আমাদের ইন্দ্রিয় দ্বারা সরাসরিভাবে প্রত্যক্ষ করা যায় না । এ ক্ষেত্রে যে প্রকার সন্নিকর্ষ হয় , তা অলৌকিকভাবে সম্পন্ন । সে কারণেই যােগজ প্রত্যক্ষকে অলৌকিক সন্নিকরূপে উল্লেখ করা হয় ।


যােগীরা অলৌকিক বিষয়সমূহ প্রত্যক্ষ করতে পারেন । সে ক্ষেত্রে যােগীদের সঙ্গে অলৌকিক বিষয়সমূহের সন্নিকর্ষ অলৌকিকরূপেই গণ্য ।







শুক্রবার, ২৯ জুলাই, ২০২২

সরল বস্তুবাদের মূল বক্তব্যগুলি কী কী ? লক কীভাবে সরল বস্তুবাদের সমালােচনা করে তার বক্তব্য উপস্থাপন করেছেন ?


একাদশ শ্রেণী দর্শন প্রশ্নোত্তর xi class 11 philosophy Question answer সরল বস্তুবাদের মূল বক্তব্যগুলি কী কী লক কীভাবে সরল বস্তুবাদের সমালােচনা করে তার বক্তব্য উপস্থাপন করেছেন sorol bostubader mul boktboguli ki ki lok kivabe sorol bostubader somalochona kore tar boktbo uposthapn korechen


উত্তর :  যে বস্তুবাদে গুনবিশিষ্ট বস্তুর জ্ঞাতার জ্ঞান নিরপেক্ষ স্বাধীন ও স্বতন্ত্র অস্তিত্বকে স্বীকার করে নেওয়া হয় — তাকে বলে সরল বস্তুবাদ । এই বস্তুবাদকে লৌকিক বস্তুবাদ রূপেও অভিহিত করা হয় । সরল বস্তুবাদ হল বস্তুবাদের একটি অত্যন্ত সহজ সরল রূপ । সরল বস্তুবাদ অনুসারে দাবী করা হয় যে, বৈচিত্রপূর্ণ বাহ্যজগতের ভৌতবস্তু সমূহকে আমরা সরাসরিভাবে প্রত্যক্ষ করি এবং সেগুলি সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করি । সরল বস্তুবাদের মূল বক্তব্যগুলিকে এভাবেই উল্লেখ করা যায়—

[1 ]বাহ্যজগতে বৈচিত্রপূর্ণ অসংখ্য বস্তুর অস্তিত্ব আছে ।

[2 ] বস্তুগুলির সঙ্গে বস্তুর ধর্ম ওতােপ্রােতভাবে জড়িত ।

[3] বাহ্যবস্তু মাত্রেই হল জ্ঞাতার সম -নিরপেক্ষ । এবং 

[4] বাহ্যবস্তুর জ্ঞান সরাসরিভাবে লন্ধ । 

[      ] প্রখ্যাত অভিজ্ঞতাবাদী দার্শনিক জন লক্ এই সরল বস্তুবাদের সমালােচনা করেছেন । তিনি বলেন যে, সরলবস্তুবাদ হলাে সাধারণ মানুষের স্থূল বিশ্বাসের উপর প্রতিষ্ঠিত একটি নির্বিচারমূলক মতবাদ । এরূপ মতবাদটি নিম্নের অভিযােগগুলির ভিত্তিতে কখনােই গ্রহণীয় নয় । 
[ 1 ] ভ্রান্তপ্রত্যক্ষের ব্যখ্যিাহীনতা : সরল বস্তুবাদ কখনােই ভ্রান্ত প্রত্যক্ষের ব্যাখ্যা দিতে পারে না ।কারণ , আমরা যদি বস্তুকে সরাসরিভাবেই জানতে পারি তাহলে ভ্রান্ত প্রত্যক্ষের বিষয়টি আসে কি করে ? 

[ 2 ]স্বপ্নজ্ঞানের ব্যাখ্যাহীনতা : বিষয়ের অস্তিত্ব না থাকলে তার জ্ঞান কখনােই সম্ভব নয় । কিন্তু স্বপ্নে দৃষ্ট বিষয়ের কোনাে স্বাধীন ও স্বতন্ত্র অস্তিত্ব থাকে না , তাহলে স্বপ্নের বিষয়টি কীভাবে উঠে আসতে পারে ? এর কোনাে সদুত্তর সরল বস্তুবাদীরা দিতে পারেন না । 


[ 3 ] প্রত্যক্ষের সার্বিক মাপকাঠিহীনতা : সরাসরিভাবে প্রত্যক্ষের ক্ষেত্রে আমাদের সার্বিক কোনাে মাপকাঠি নেই । কারণ আমাদের একই বস্তু ভিন্ন ভিন্ন ভাবে প্রত্যক্ষিত হতে পারে । এর ফলে বস্তুর সরাসরি প্রত্যক্ষে কোনাে সার্বিক মাপকাঠি থাকতে পারে না এবং বাহ্যবস্তুর সার্বিক জ্ঞান  অসম্ভব হয়ে পড়ে । 

[       ]  সরল বস্তুবাদের সমালােচনা করে লক দেখিয়েছেন যে , সরল বস্তুবাদ কখনােই যথার্থ ও অযথার্থ জ্ঞানের মধ্যে পার্থক্য করতে পারে না । কারণ , সমস্ত বিষয়ের জ্ঞান যদি সরাসরিভাবে পাওয়া যায় তাহলে সব জ্ঞানই যথার্থ হতে বাধ্য । অযথার্থ জ্ঞান বলে তাই কোনাে কিছুই থাকতে পারে না । কিন্তু একথা সত্য যে, আমাদের সমস্ত জ্ঞান কখনােই যথার্থ হতে পারে না । অযথার্থ জ্ঞানও কিছু থেকেই যায় । সেকারণেই লক্ সরলবস্তুবাদের  সমালােচনা করে তার প্রতিনিধিত্বমূলক বস্তুবাদের উপস্থাপনা করেছেন । যে মতবাদ বস্তুর মন -নিরপেক্ষ স্বাধীন ও স্বতন্ত্র অস্তিত্বকে স্বীকার করে নেয় এবং বস্তুর জ্ঞানকে সরাসরিভাবে পাওয়া যায় না বলে , বস্তুর ধারণা বা প্রতিরূপের মাধ্যমে পাওয়া যায় বলে দাবী করা হয় , তাকে বলে প্রতিরূপী বস্তুবাদ । 


[         ] লকের মতে , আমাদের মন হল একটি স্বচ্ছ পর্দার মতাে । মনের এই স্বচ্ছ পর্দার উপর অভিজ্ঞতার ফলে বস্তুর ছাপ বা ধারণা প্রতিফলিত হয় । এই সমস্ত ধারণাগুলির মাধ্যমেই আমরা বস্তুকে পরােক্ষভাবে জানতে পারি । অর্থাৎ অভিজ্ঞতার ফলে বস্তুর মুখ্য ও গৌণ গুণগুলি ধারণার সৃষ্টি করে এবং এই সমস্ত ধারণাগুলি মনের স্বচ্ছ পর্দায় ভেসে ওঠে এবং বস্তু সম্পর্কে পরােক্ষ জ্ঞান দান করে ।





বৃহস্পতিবার, ২৮ জুলাই, ২০২২

কর্মযােগ বলতে কী বােঝ ? কর্মযােগ সম্পর্কিত বিবেকানন্দের দার্শনিক ভাবনা ব্যাখ্যা করো ।

একাদশ শ্রেণী দর্শন প্রশ্নোত্তর xi class 11 philosophy Question answer কর্মযােগ বলতে কী বােঝ কর্মযােগ সম্পর্কিত বিবেকানন্দের দার্শনিক ভাবনা ব্যাখ্যা করো karmayog bolte ki bojho karmayog somporkito bibekanonder darshonik vabna bakkha koro


উত্তর :  কর্মযােগ শব্দটির শব্দগত বিশ্লেষণ — কর্ম+যােগ = কর্মযােগ । কর্ম শব্দটি সংস্কৃত কৃ ধাতু থেকে নিষ্পন্ন —যার অর্থ হল কোনাে কিছু করা । আর যােগ শব্দের অর্থ হল সুচিন্তিত, সুনিয়ন্ত্রিতও বিধিবদ্ধ বা বিজ্ঞানসম্মতভাবে কর্ম করা । সুতরাং কর্মযােগ শব্দটির সামগ্রিক অর্থ হল সুনিয়ন্ত্রিত , সুচিন্তিত ও বিধিবদ্ধভাবে কোনাে কিছু করা । সহজ করে বলা যায় যে , কর্মের কৌশল তথা কর্মনৈপুণ্যই হল কর্মযােগ । প্রকৃতপক্ষে সমত্ব চেতনাই হল যােগ শব্দটির প্রকৃত অর্থ । লাভ -অলাভ ,জয় -পরাজয় প্রভৃতি সমস্ত কিছুকেই যদি সমান জ্ঞান করে কর্ম করা হয় তাকেই কর্মযােগ বলা হয় । গীতা , উপনিষদ , বেদান্ত দর্শনে কর্মযােগের এরূপ ধারণাটিই প্রতিফলিত হয়েছে । বেদান্তের অনুগামী হয়ে বিবেকানন্দও কর্মযােগের এই অর্থ বা ধারণাটিকেই গ্রহণ করেছেন । 

[ 1 ] কর্মে আত্মনিয়ােগ : বিবেকানন্দের মতে , প্রত্যেকটি মানুষের মধ্যেই সত্ত্ব,রজঃ ও তমঃগুণ পরিলক্ষিত হয় । আর এই গুণের তারতম্যের জন্যও তাদের কর্ম বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন রকম হয় । যখন আমাদের মধ্যে তমােগুণ প্রবল হয়ে ওঠে , তখন আমরা আলস্যপরায়ণ ও নিষ্কর্মা হয়ে পড়ি । আবার আমাদের মধ্যে যখন রজঃগুণের প্রাবল্য লক্ষিত হয় , তখন আমরা দারুণভাবে কর্মশীল হয়ে উঠি । আর আমাদের মধ্যে যখন সত্ত্বগুণের আধিক্য লক্ষিত হয়, তখন আমরা সমত্ববুদ্ধিসম্পন্নহয়ে ক্রিয়া করি এবং এর ফলে আমাদের মধ্যে একপ্রকার শান্তভাব বিরাজ করে । বিবেকানন্দ দাবি করেন যে ,সম্পূর্ণভাবে প্রশান্তি (শান্তভাব) লাভ করতে হলে মানুষকে কর্ম করতেই হবে । আলস্য ত্যাগ করে মানুষকে প্রকৃত অর্থেই কর্মবীর হতে হয় ।


 [ 2 ] শারীরিক ও আধ্যাত্মিক শক্তির জাগরণ : বিবেকানন্দের মতে , সাধারণ লােক তাদের জীবনযাপনের জন্য বিভিন্ন প্রকার কর্ম সম্পাদন করে থাকে । এগুলি মূলত ঐহিক উদ্দেশ্যকে সিদ্ধ করে । এই সমস্ত কর্ম যে তুচ্ছ বা ছােটো তা নয় ।কিন্তু তিনি বলেছেন যে, পারত্রিক উদ্দেশ্যে কৃত  কর্মই হল শ্রেষ্ঠ । আধ্যাত্মিকতাই আমাদের জীবনে সকল প্রকার কর্ম প্রচেষ্টার মূলভিত্তি । আধ্যাত্মিক দিক থেকে যিনি সুস্থ ও সবল থাকেন তিনি ইচ্ছা করলে অন্যান্য দিকেও প্রভূত দক্ষ হতে পারেন ।   
 

[ 3 ] আত্মজ্ঞান লাভ : কর্মযােগে বিবেকানন্দ উল্লেখ করেছেন , কর্মের দ্বারাই মানুষের জীবন নিয়ন্ত্রিত হয় । মনুষ্যকৃত কর্মের ভালাে -মন্দ, পাপ পুণ্য এই উভয় দিকই বিদ্যমান । অর্থাৎ, কর্মের ক্ষেত্রে পরস্পর বিরুদ্ধ দিক পরিলক্ষিত হয় । কর্মনির্ধারিত - মানবজীবনে কখনােই কর্মকে এড়িয়ে চলা যায় না ।এই কর্মের জন্যই কর্মফলের বিষয়টি উত্থিত হয় । কর্মফল এক জীবনে সম্ভব না হলেও পরজন্মে সেই ফলভােগ বর্তায় । সেকারণেই মনুষ্যকর্মের সহযােগীর ভূমিকা গ্রহণ করে জন্মান্তরবাদ । জন্মান্তরবাদের ব্যাখ্যায় দুটি উদ্দেশ্য সিদ্ধ হয় —প্রথমত ব্যক্তির ব্যক্তিত্ব খর্ব হয় এবং দ্বিতীয়ত আত্মতত্ত্বের সঞ্জীবন হয় । আত্মতত্ত্বে উল্লেখ করা হয়েছে যে, আত্মা চিরন্তন , অমর ও জন্মমৃত্যুরহিত । জন্ম হল আত্মার শরীরধারণ আর মৃত্যু হল আত্মার শরীরমুক্তি । আমাদের সকল প্রকার কর্মের উৎসই হল শরীর , আবার কর্ম শরীরের মন্ত্র বা ধারকরূপে গণ্য । 

[ 4 ] কমই হল আধ্যাত্মিক শিক্ষার পাঠশালা : বিবেকানন্দ বলেন যে, আমাদের সংসার জীবনের কর্মই হল আধ্যাত্মিক শিক্ষার পাঠশালা । যদি কেবলমাত্র সাংসারিক লাভের জন্যই কাজ করা হয় , তবে তা আত্মার বন্ধনকেই বাড়িয়ে তােলে । কিন্তু যদি যথাযথ আত্মজ্ঞানের জন্য কর্ম করা হয় , তাহলে তা অদ্বৈত বেদান্তের মূল কথা — ‘অহং ব্রহ্লাস্মি’ বা ‘তত্ত্বমসি’ রূপ উপলব্ধির চরম উৎকর্ষতাকেই সূচিত করে । এখানেই স্বামী বিবেকানন্দের কর্মযােগের উদ্দেশ্যটি নিহিত ।



বুধবার, ২৭ জুলাই, ২০২২

সন্নিকর্ষ কাকে বলে ? ন্যায়দর্শন স্বীকৃত লৌকিক সন্নিকর্ষগুলি দৃষ্টান্ত-সহ ব্যাখ্যা করাে ।

একাদশ শ্রেণী দর্শন প্রশ্নোত্তর xi class 11 philosophy Question answer সন্নিকর্ষ কাকে বলে ন্যায়দর্শন স্বীকৃত লৌকিক সন্নিকর্ষগুলি দৃষ্টান্তসহ ব্যাখ্যা করাে sonnikorsho kake bole sonnikorshoguli drishtantosoho bakkha koro


উত্তর : ন্যায়দর্শনে সন্নিকর্ষ শব্দটির অর্থ হল সংযােগ । সংযােগ হল ইন্দ্রিয়ের সঙ্গে বিষয় বা অর্থের সংযােগ । যখন আমরা কোনাে ঘট প্রত্যক্ষ করি , তখন সেই ঘট নামক বিষয়ের সঙ্গে চক্ষু নামক ইন্দ্রিয়ের সংযােগ হয় । এর ফলেই আমাদের ঘট - প্রত্যক্ষ সম্ভব হয় । 
সন্নিকর্ষের প্রকারভেদ : ন্যায়দর্শনে সন্নিকর্ষ হল দুপ্রকার [ 1 ]লৌকিক এবং [2] অলৌকিক । ইন্দ্রিয়ের সঙ্গে বিষয়ের যদি সরাসরিভাবে সংযােগ হয় , তবে তাকেই বলা হয় লৌকিক সন্নিকর্ষ । যেমন — ঘট এবং চক্ষুর সংযােগ বা সন্নিকর্ষ । অপরদিকে , ইন্দ্রিয়ের সঙ্গে বিষয়ের যদি পরােক্ষ সংযােগ হয় , তবে তাকেই বলা হয় অলৌকিক সন্নিকর্ষ । যেমন —মানুষ প্রত্যক্ষ করে , মনুষ্যত্বের সঙ্গে সংযােগ বা সন্নিকর্ষ পরােক্ষভাবে সম্পন্ন করা যায় । 


 ন্যায়মতে , লৌকিক সন্নিকর্ষহল ছয় প্রকার । এগুলি হল— 
 
[ 1 ] সংযােগ সন্নিকর্ষ : একটি দ্রব্যের সঙ্গে আর একটি দ্রব্যের সংযােগকেই বলা হয় সংযােগ সন্নিকর্ষ । চক্ষুর দ্বারা ঘট দ্রব্যের প্রত্যক্ষের ক্ষেত্রে সংযােগ সন্নিকর্ষ হয় । কারণ , ঘটও একটি দ্রব্য, আর চক্ষুও একটি দ্রব্যরূপে গণ্য । সুতরাং , চক্ষু দ্রব্য + ঘট দ্রব্য = সংযােগ সন্নিকর্ষ । 

[ 2 ] সংযুক্ত সমবায় সন্নিকর্ষ : ইন্দ্রিয়ের সঙ্গে দ্রব্যের গুণের যে সংযােগ , তাকেই বলা হয় সংযুক্ত -সমবায় সন্নিকর্ষ । চক্ষুর সঙ্গে ঘটের সম্বন্ধ হল সংযােগ সম্বন্ধ। আবার ঘটের সঙ্গে ঘটরূপের সম্বন্ধ হল সমবায় সম্বন্ধ । সুতরাং যৌথভাবে চক্ষুর সঙ্গে ঘটরূপের সম্বন্ধ হল সংযুক্ত সমবায় সম্বন্ধ ।

[ 3 ] সংযুক্ত সমবেত সমবায় সন্নিকর্ষ : ইন্দ্রিয়ের দ্বারা কোনাে দ্রব্যের গুণ প্রত্যক্ষকালে সেই গুণে গুণত্বজাতি থাকে । সেই গুণত্বজাতির প্রত্যক্ষে যে সন্নিকর্ষ হয় , তাকেই বলা হয় সংযুক্ত সমবেত  সমবায় সন্নিকর্ষ । ঘট প্রত্যক্ষের ক্ষেত্রে ঘটের সঙ্গে চক্ষুর সংযােগ সন্নিকর্ষ হয় । আবার ঘটের সঙ্গে ঘটরূপের সমবায় সন্নিকর্ষ হয় । ঘটরূপের সঙ্গে রূপত্বজাতিরও সমবায় সন্নিকর্ষ হয় ৷ ফলত , এক্ষেত্রে সংযুক্ত সমবেত সমবায় সন্নিকর্ষ সম্পন্ন হয় । 
[ 4 ] সমবায় সন্নিকর্ষ : কর্ণেন্দ্রিয়ের দ্বারা শব্দ প্রত্যক্ষের ক্ষেত্রে সমবায় সন্নিকর্ষ সম্পন্ন হয় । কারণ , শব্দ হল ব্যোম বা আকাশের গুণ এবং কর্ণেন্দ্রিয় নিজেই আকাশরূপে গণ্য । গুণ ও গুণীর সম্বন্ধই হল সমবায় সন্নিকর্ষ । 


[ 5 ] সমবেত সমবায় সন্নিকর্ষ : শব্দের প্রত্যক্ষকালে ওই শব্দে আশ্রিত শব্দত্ব জাতিরও প্রত্যক্ষ হয় । কর্ণেন্দ্রিয়ের দ্বারা শব্দে শব্দত্ব জাতির প্রত্যক্ষে যে সন্নিকর্ষ হয়, তাকেই বলা হয় সমবেত সমবায় সন্নিকর্ষ । 


[ 6 ] বিশেষণ -বিশেষ্যভাব সন্নিকর্ষ : অভাব প্রত্যক্ষের ক্ষেত্রে যে সন্নিকর্ষ হয় , তাকে বলা হয় বিশেষণ -বিশেষ্যভাব সন্নিকর্ষ । ভূতলে ঘটাভাবের ক্ষেত্রে ভূতল হল বিশেষ্য , আর ঘটের অভাব হল বিশেষণ । বিশেষ্য তথা ভূতলে , বিশেষণ তথা ঘটাভাবের প্রত্যক্ষই হল বিশেষণ বিশেষ্যভাব সন্নিকর্ষ । 




মঙ্গলবার, ২৬ জুলাই, ২০২২

জ্ঞানােৎপত্তি সংক্রান্ত দেকার্তের মতবাদটি আলােচনা করো ।

একাদশ শ্রেণী দর্শন প্রশ্নোত্তর xi class 11 philosophy Question answer জ্ঞানােৎপত্তি সংক্রান্ত দেকার্তের মতবাদটি আলােচনা করো ganoutpotti songkraanto dekater motonadti alochona koro


উত্তর :  বুদ্ধিবাদের মূল বক্তব্য এই যে , বুদ্ধিই হল জ্ঞানের মৌল উৎস । বুদ্ধিকে জ্ঞানের মূল উৎসরূপে স্বীকার করে নিলেও , সমস্ত বুদ্ধিবাদী দার্শনিকরা দু -ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছেন— [ 1 ] চরমপন্থী ও [ 2 ] নরমপন্থী । চরমপন্থী বুদ্ধিবাদের মূল বক্তব্য এই যে , বুদ্ধি বা প্রজ্ঞাই হল জ্ঞানের একমাত্র উৎস । এ ছাড়া জ্ঞানের আর দ্বিতীয় কোনাে উৎস নেই । চরমপন্থী বুদ্ধিবাদের অন্যতম প্রবক্তা হলেন প্রখ্যাত ফরাসি দার্শনিক রেনে দেকার্ত । রেনে দেকার্ত আধুনিক পাশ্চাত্য দর্শনের জনকরূপেও গণ্য ।

[         ] চরমপন্থী বুদ্ধিবাদী দার্শনিক দেকার্ত মনে করেন যে , বুদ্ধি বা প্রজ্ঞাই হল জ্ঞানের একমাত্র উৎস । কারণ , বুদ্ধি বা প্রজ্ঞার দ্বারা যে জ্ঞান পাওয়া যায় তা যথার্থ, সুনিশ্চিত , অনিবার্য ও সর্বজনীনরূপে গণ্য । দেকার্তের মতে ,ইন্দ্রিয় সংবেদনের দ্বারা কখনােই সার্বিক জ্ঞান লাভ সম্ভব নয় । বিশুদ্ধ বুদ্ধিই কেবলমাত্র আমাদের সার্বিক জ্ঞান প্রদান করতে পারে । 


[        ] দেকার্ত জ্ঞানের মাপকাঠি হিসেবে স্পষ্টতা , স্বচ্ছতা ও প্রাঞ্জলতার কথা উল্লেখ করেন । অর্থাৎ , তার মতে , জ্ঞানরূপে কোনাে বিষয়কে গণ্য হতে গেলে , তাকে স্পষ্ট, স্বচ্ছ ও প্রাঞ্জলরূপে গণ্য হতে হবে । আর এই ধরনের জ্ঞান কখনােই ইন্দ্রিয় অভিজ্ঞতায় লাভ করা যায় না । কেবলমাত্র বিশুদ্ধ বুদ্ধিই এই ধরনের জ্ঞান প্রদান করতে পারে । তার মতে , গণিতের জ্ঞানই হল এরূপ আদর্শ জ্ঞান । কারণ , গণিতের জ্ঞানগুলি সংশয়াতীত এবং এগুলি স্পষ্ট, স্বচ্ছ ও প্রাঞ্জলরূপে গণ্য করা হয় । গণিতের সুনিশ্চিত জ্ঞানের মতাে দর্শনেও সুনিশ্চিত জ্ঞানলাভের আশায় দেকার্ত দর্শনতত্ত্বের ক্ষেত্রে গাণিতিক পদ্ধতির অনুসরণ করেন । 

[        ] দেকার্তের মতে , গণিতের ক্ষেত্রে কয়েকটি স্বতঃসিদ্ধ সূত্রের ওপর নির্ভর করে অবরােহ পদ্ধতির সাহায্যে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয় । এই ধরনের সিদ্ধান্তগুলি অবশ্যই সুনিশ্চিত ও সার্বিকরূপে গণ্য । তিনি তাই দাবি করেন যে , দর্শনের ক্ষেত্রেও যদি বুদ্ধিলব্ধ স্বতঃসিদ্ধ সহজাত ধারণার ওপর ভিত্তি করে অবরােহ পদ্ধতি অনুযায়ী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয় ,তাহলে তাও নিশ্চিত ও সার্বিকরূপে গ্রাহ্য হবে । আর দর্শনের ক্ষেত্রে গাণিতিক ও অবরােহাত্মক পদ্ধতির প্রয়ােগ করতে হলে , অবশ্যই বুদ্ধি বা প্রজ্ঞার ওপর নির্ভরশীল হতে হবে , কখনােই ইন্দ্রিয় অভিজ্ঞতার ওপর নয় । 



[         ]  দর্শনের ক্ষেত্রে সুনিশ্চিত ও স্বতঃসিদ্ধ জ্ঞানলাভের জন্য দেকার্ত আরও একটি পদ্ধতির অনুসরণ করেছেন এবং তা হল সার্বিক সংশয় পদ্ধতি । এরূপ পদ্ধতি অনুসারে যথার্থ, সুনিশ্চিত ও সার্বিক জ্ঞান লাভের আশায় প্রচলিত সমস্ত জ্ঞানকেই সংশয় বা সন্দেহ করতে হয় । এরূপ সংশয় বা সন্দেহ করার মাধ্যমে তিনি এই সত্য অনুভব করেন যে , সমস্ত কিছুকে সংশয় করা গেলেও , সংশয়কে আর সন্দেহ করা যায় না । অথাৎ ,সংশয় যে আছে , তা প্রমাণিত । আর সংশয় থাকলেই সংশয়কর্তাও থাকবে এবং সেটাই হল নিশ্চিত জ্ঞান ।এভাবেই তিনি তার সংশয়াতীত যে সত্যমূলক বাক্যে উপনীত হয়েছেন ,তা হল— ‘আমি চিন্তা করি , অতএব আমি আছি’ । দেকার্তের দর্শনে এটিই হল বুদ্ধিলব্ধ প্রথম স্বতঃসিদ্ধ জ্ঞান । 

[        ] দেকার্তের চরমপন্থী বুদ্ধিবাদ মূলত কতকগুলি স্বতঃসিদ্ধ নিয়ম ও সহজাত ধারণার ওপর নির্ভর করে প্রতিষ্ঠিত । দেকার্ত দাবি করেন যে ,আমাদের কোনাে কোনাে ধারণা হল সহজাত এবং এই সহজাত ধারণার দ্বারাই যথার্থ ও সত্যজ্ঞান লাভ করা সম্ভব । কিন্তু যে সহজাত ধারণাকে তিনি জ্ঞানের মৌল ভিত্তিরূপে উল্লেখ করেছেন , সেগুলিকে প্রখ্যাত অভিজ্ঞতাবাদী দার্শনিক জন লক বিভিন্ন যুক্তি সহকারে অস্বীকার করেছেন । 





সোমবার, ২৫ জুলাই, ২০২২

কার্যকারণ সম্বন্ধের পরিপ্রেক্ষিতে সাধারণ বা লৌকিক মত কি ?

একাদশ শ্রেণী দর্শন প্রশ্নোত্তর xi class 11 philosophy Question answer কার্যকারণ সম্বন্ধের পরিপ্রেক্ষিতে সাধারণ বা লৌকিক মত কি karjokaron sombondhe sadharon ba loukik mot ki


উত্তর : কার্যকারণ সম্বন্ধ বিষয়ে সাধারণ বা লৌকিক মত খুবই গুরুত্বপূর্ণ । কার্যকারণ সম্বন্ধের পরিপ্রেক্ষিতে সাধারণ মানুষের এক বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গি আছে । আমাদের জীবনের প্রাত্যহিক অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করেই মূলত এরূপ মতবাদটি গড়ে উঠেছে । দৈনন্দিন অভিজ্ঞতায় লাভ করা সাধারণ মানুষের লৌকিক বিশ্বাসই হল এরূপ মতবাদের মৌল ভিত্তি । সে কারণেই কার্যকারণ সম্পর্কিত সাধারণ মানুষের মতবাদকে লৌকিক মতবাদরূপে গণ্য করা হয় । কার্যকারণ সম্পর্কিত লৌকিক মতবাদের ক্ষেত্রে কিছু বৈশিষ্ট্য লক্ষ করা যায় ।
 

[        ] সমকালীন ও পারস্পরিক সম্বন্ধযুক্ত: লৌকিক মতে ,কারণ ও কার্য হল দুটি সমকালীন ঘটনা এবং একটি অপরটির সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত । তাদের মতে , এই পার্থিব জগতে কোনাে ঘটনাই বিচ্ছিন্ন নয় । হঠাৎ বা দৈবাৎ কোনাে কিছুই ঘটতে পারে না । তাই একটি ঘটনা আর একটি ঘটনার কারণ বা কার্যরূপে গণ্য হয় । 


[        ] কারণের পরে কার্য : লৌকিক মতে , যে দুটি ঘটনার মধ্যে কার্যকারণ সম্বন্ধ পরিলক্ষিত হয়, তাদের মধ্যে আগে যে ঘটনাটি ঘটে , তাকেই বলা হয় কারণ । আর কারণের পরে যে ঘটনাটি ঘটে , তাকে বলা হয় কার্য ৷ তাই কারণকে কার্যের অগ্রগামীরূপে উল্লেখ করা হয় এবং কার্যকে কারণের অনুগামীরূপে দাবি করা হয় । 

[         ] কার্য উৎপাদনের শক্তি হিসেবে কারণ : ‘একটি ঘটনা আর -একটি ঘটনার কারণ ’ –এরূপ বলার অর্থই হল , কারণরূপ ঘটনাটির মধ্যে এমনই এক শক্তি থাকে , যার দ্বারা কার্যরূপ ঘটনাটির উৎপত্তি তথা আবির্ভাব সম্ভব হয় । সুতরাং , কারণরূপ শক্তির মূর্তপ্রকাশই হল কার্য ৷ একইভাবে , দুধের মধ্যে পুষ্টিসাধক ক্ষমতা নিহিত আছে বলেই আমরা দাবি করি , দুধ পান করলে দৈহিক পুষ্টি হয় ।অর্থাৎ , দুধই হল পুষ্টির কারণ । 



[         ] কার্যের উৎপাদকরূপে কারণ : যে ঘটনা অন্য একটি ঘটনাকে ঘটায় , তাকেই বলা হয় কারণ । আর যা ঘটিত বা উৎপন্ন হয় ,তাকেই বলা হয় কার্য । তাই কারণ হল কার্যের স্রষ্টা,আর কার্য হল কারণের সৃষ্টি । কারণ ও কার্যের মধ্যে তাই স্রষ্টা ও সৃষ্টির সম্পর্ক বিদ্যমান । কুমাের যখন মাটির ঘট সৃষ্টি করে , তখন কুমােরকে বলা হয় কারণ , আর সৃষ্ট মাটির ঘটকে বলা হয় কার্য ৷ 


[         ] অনিবার্য বা আবশ্যিক সম্পর্ক : লৌকিক বিশ্বাস অনুযায়ী , কোনো কারণ উপস্থিত থাকলে তার কার্যও উপস্থিত হবে । অন্যভাবে বলা যায় কোনাে যে , কোনাে কার্য উৎপন্ন হলে তার পিছনে একটি কারণ  অবশ্যই থাকবে । অর্থাৎ , কারণ ও কার্যের মধ্যে একপ্রকার অনিবার্য  সম্বন্ধ বিদ্যমান ।সুতরাং , কারণ ও কার্য কখনােই বিচ্ছিন্নভাবে থাকতে পারে না । এভাবেই ক - কে খ-এর কারণরূপে উল্লেখ করলে , বলতে হয় যে ক ঘটলে খ ঘটবেই ।  





রবিবার, ২৪ জুলাই, ২০২২

প্রসক্তি সম্বন্ধ কাকে বলে ? কারণ ও কার্য বিষয়ে প্রসক্তি তত্ত্ব সমালােচনা - সহ ব্যাখ্যা করাে ।

একাদশ শ্রেণী দর্শন প্রশ্নোত্তর xi class 11 philosophy Question answer প্রসক্তি সম্বন্ধ কাকে বলে কারণ ও কার্য বিষয়ে প্রসক্তি তত্ত্ব সমালােচনা সহ ব্যাখ্যা করাে prosokti sombondha kake bole karon o karjo bishoye prosokti totto somalochonasoho bakkha koro



উত্তর : কার্যকারণ সম্পর্কে বুদ্ধিবাদীদের অভিমতকে আবশ্যিক বা অবশ্যম্ভব মতবাদরূপে উল্লেখ করা হয় । এরূপ অভিমতের পরিপ্রেক্ষিতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, কার্যের ধারণাটি অনিবার্য বা আবশ্যিকতার কারণের ধারণা থেকে নিঃসৃত হয় । অর্থাৎ , কারণ ও কার্যের মধ্যে একপ্রকার আবশ্যিকতার সম্পর্ক আছে । কারণ ও কার্যের মধ্যে এই আবশ্যিকতার সম্বন্ধটি কীরূপ তা বােঝাতে গিয়েই প্রখ্যাত বুদ্ধিবাদী দার্শনিক ইউয়িং কার্যকারণের সম্বন্ধের ক্ষেত্রে প্রসক্তি সম্বন্ধের বিষয়টিকে উল্লেখ করেছেন ।

[         ] কার্যকারণ বিষয়ে প্রসক্তি তত্ত্বের মূল বক্তব্য :  প্রসক্তি সম্বন্ধ হল এমনই একপ্রকার অনিবার্যতার কোনাে সম্বন্ধ যা একটি বৈধ অবরোহ অবরােহ যুক্তির ক্ষেত্রে দেখা যায় । কারণ , যে কোনো বৈধ অবরােহ যুক্তির ক্ষেত্রেই দেখা যায় যে , সিদ্ধান্তটি অনিবার্যভাবে যুক্তিবাক্য থেকে নিঃসৃত হয় । সেক্ষেত্রে যুক্তিবাক্য এবং সম্বন্ধটি একপ্রকার আবশ্যিক গ্রাহ্য সম্বন্ধরূপে গণ্য । বৈধ অবরোহ যুক্তিতে যদি যুক্তিবাক্য গুলি সত্যরূপে গ্রাহ্য হয় তবে তা থেকে একটি সত্য সিদ্ধান্ত নিঃসৃত না হয়ে পারে না । অর্থাৎ যুক্তিবাক্য থেকে সিদ্ধান্তটি অনিবার্যভাবে নিঃসৃত হয় । এরূপ বিষয়ের কোনাে ব্যতিক্রম হতে পারে না । অনুরূপভাবে বলা যায় যে , কারণের ধারণাটি থেকেও অনিবার্যভাবে কার্যের ধারণাটি নিঃসৃত হয় । কার্য নামক ঘটনাটি আছে অথচ তা কোনাে কারণ থেকে নিঃসৃত নয় — এমনটি  কখনােই হতে পারে না । সুতরাং , কার্য ও কারণের সম্বন্ধটি হল প্রসক্তি সম্বন্ধের অনুরূপ । 

[        ] প্রসক্তি সম্বন্ধের মূল বক্তব্যকে আমরা যেভাবে উল্লেখ করতে পারি , তা হল – 


i . কারণ ও কার্য কখনােই দুটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয় ।

ii . এই দুটি ঘটনা একে অপরের সঙ্গে ওতপ্রােতভাবে জড়িত । 

iii কারণের ধারণা থেকে কার্যের ধারণাটি অনিবার্যভাবে নিঃসৃত হয় । অর্থাৎ এদের সম্বন্ধটি অনিবার্যতার সম্বন্ধ । 

iv . কারণ থেকে কার্যের নিঃসরণের বিষয়টি যুক্তিবাক্য এবং সিদ্ধান্তের মধ্যে প্রসক্তি সম্বন্ধের সঙ্গে তুলনীয় । কারণকে হেতুরূপে এবং কার্যকে তার ফল বা সিদ্ধান্তরূপে গণ্য করা হয় । 


v . কার্যকারণ সম্বন্ধের ধারণা হল একটি সহজাত ধারণা । এরূপ সহজাত ধারণা আমাদের আছে বলেই আমরা ধারণা দুটিকে পাশাপাশি রেখে তাদের মধ্যে কার্যকারণ সম্বন্ধ নির্ণয় করতে পারি । 

[         ]  প্রখ্যাত অভিজ্ঞতাবাদী দার্শনিক ডেভিড হিউমের আগে পর্যন্ত মতবাদটি বিশেষ কোনাে সমালােচনার মুখােমুখি আসেনি । কিন্তু হিউম তার অভিজ্ঞতাবাদের দৃষ্টিকোণ থেকে এরূপ মতবাদটির কঠোর সমালােচনা করেছেন । এ সম্পর্কে হিউমের অভিযােগগুলি হল—  


প্রথমত , কার্যকারণ সম্পর্কের ক্ষেত্রে কারণ ও কার্য নামক ঘটনা দুটিকে প্রত্যক্ষ করা যায় ঠিকই , কিন্তু তাদের মধ্যে যে প্রসক্তি বা অনিবার্যতার সম্বন্ধ আছে — তাকে কীভাবে প্রত্যক্ষ করা যায় ? এরূপ বিষয়টি তাই কখনােই অভিজ্ঞতার নিরিখে গ্রাহ্য নয় ।  


দ্বিতীয়ত , কার্য ও কারণের মধ্যে যদি প্রসক্তি বা অনিবার্যতার সম্বন্ধ থেকেই থাকে তাহলে কারণ - কে বিশ্লেষণ করলে কার্য-র ধারণাটি পাওয়া যেত । কিন্তু কখনােই পাওয়া যায় না ৷ কারণ জলকে (কারণ )বিশ্লেষণ করলে আমরা তৃষ্ণা নিবারণের (কাৰ্য) বিষয়টিকে মােটেই পাই না । 

তৃতীয়ত , প্রসক্তিবাদীরা কার্যকারণের সম্বন্ধটিকে বৈধ অবরােহ যুক্তির সঙ্গে তুলনা করেছেন — যা আদৌ যুক্তিযুক্ত নয় । কারণ , কার্যকারণ সম্বন্ধে বিষয়টি হল অভিজ্ঞতালব্ধ আরােহ অনুমানের বিষয়, কখনােই অবরোহ অনুমানের বিষয় নয় । 


চতুর্থত , প্রসক্তিবাদীরা কারণ ও হেতুকে একই অর্থে প্রয়ােগ করেছেন । কিন্তু কারণ ও হেতু কখনোই একই অর্থে ব্যবহৃত হতে পারে না । হেতু শব্দটি কারণ ছাড়াও , ‘যেহেতু’, ‘এজন্য’ প্রভৃতিকেও বোঝাতে পারে ।




শনিবার, ২৩ জুলাই, ২০২২

আত্মগত ভাববাদের পরিপ্রেক্ষিতে বার্কলের মূল বক্তব্যটি কি ?

একাদশ শ্রেণী দর্শন প্রশ্নোত্তর xi class 11 philosophy Question answer আত্মগত ভাববাদের পরিপ্রেক্ষিতে বার্কলের মূল বক্তব্যটি কি attmagoto vabbader poriprekkhite barkoler mul boktboti ki


উত্তর : বার্কলের মতে ,এই জগতে শুধুমাত্র জ্ঞাতার মন এবং মনের ধারণাই আছে । এর অতিরিক্ত আর কোনাে কিছুই নেই । আর ধারণাগুলি অবশ্যই জ্ঞাতার মননির্ভর । পাশ্চাত্য দর্শনের ইতিহাসে এরূপ মতবাদই আত্মগত ভাববাদ নামে খ্যাত । আত্মগত ভাববাদের সপক্ষে বার্কলের মূল বক্তব্যগুলি হল— 

[        ] জ্ঞানের মৌল উৎস : ইন্দ্রিয় অভিজ্ঞতাই হল আমাদের সমস্ত জ্ঞানের মৌল উৎস । ইন্দ্রিয় অভিজ্ঞতা -নিরপেক্ষভাবে কোনাে জ্ঞানই উৎসারিত  হতে পারে না । 


[        ] বস্তুর ধারণা বা বস্তুধর্ম: ইন্দ্রিয় অভিজ্ঞতায় আমরা যা জানতে পারি , তা হল বস্তুর ধারণা , কখনােই বস্তু নয় । বস্তু হল আমাদের ইন্দ্রিয় অভিজ্ঞতার বাইরের বিষয় । বস্তুর ধারণাকে সাধারণত বস্তু বা বস্তুধর্মরূপে উল্লেখ করা হয়। কারণ ,ধারণার মাধ্যমেই আমরা বস্তুকে জানি ।


[        ] জড়দ্রব্যের অস্তিত্ব অলীক : ধারণার পশ্চাতে যে অজ্ঞাত ও অজ্ঞেয় আধাররূপ জড়দ্রব্যের অস্তিত্বকে স্বীকার করা হয়েছে , তা অবশ্যই এক যুক্তিহীন ও অবাস্তব ব্যাপার । 

[        ] মুখ্য ও গৌণ গুণের পার্থক্যকে অস্বীকার : ধারণা গঠিত হয় মুখ্য ও গৌণ গুণের সমন্বয়ে । বার্কলে মুখ্য ও গৌণ গুণের পার্থক্যকে অস্বীকার করেছেন । তার মতে , মুখ্য ও গৌণ — এই উভয়প্রকার গুণই হল জ্ঞাতার মননির্ভর ।


[          ] অস্তিত্ব প্রত্যক্ষনির্ভর : বার্কলের আত্মগত ভাববাদের দাবি হল যে, আমাদের প্রত্যক্ষের ওপর কোনাে কিছুর অস্তিত্ব নির্ভরশীল হয় । তাঁর মূল তত্ত্বই হল অস্তিত্ব প্রত্যক্ষনির্ভর । 



[          ] একমাত্র অস্তিত্বশীল বিষয় হল ধারণা : শুধুমাত্র ধারণাই হল অস্তিত্বশীল বিষয় , কারণ এগুলিকে প্রত্যক্ষ করা যায় । ধারণা ছাড়া আর অন্য কোনাে কিছুই প্রত্যক্ষযােগ্য নয় এবং তাই সেগুলি অস্তিত্বশীলও নয় । 



[           ] জড়বস্তুর অনস্তিত্বশীলতা : এই জগতে শুধুমাত্র জ্ঞাতা, জ্ঞাতার মন ও তার ধারণাই আছে । জড়বস্তু বলে কোনাে কিছু নেই । 


[          ] অহংসর্বস্ববাদ : বার্কলের আত্মগত ভাববাদের অনিবার্য পরিণতি হল অহংসর্বস্ববাদ । কারণ , কেবলমাত্র আমার ( অহং ) এবং আমার ধারণা ছাড়া আর কোনাে কিছু স্বীকৃত হয়নি । অবশ্য এই অহংসর্বস্ববাদ থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য বার্কলে ঈশ্বরের অস্তিত্বকে স্বীকার করেছেন ।